জ্বালানি সংকট যে চাপে ফেলেছে দেশের পোশাকশিল্পকে
- গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রয়াদেশ কমেছে
- ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় ২-৩ শতাংশ বেড়েছে

বাংলাদেশের গাজীপুরে একটি কারখানার সেলাই বিভাগে পোশাক তৈরি করছেন শ্রমিকেরা। ছবি : রয়টার্স
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি।
ফলে একদিকে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা।
সাম্প্রতিক সময়ে এক জরিপে ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার পরিস্থিতি উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রেতারা পণ্যের ক্রয়াদেশ বাতিল করেছেন অথবা কমিয়ে দিয়েছেন।
একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সংকটের কারণে পণ্য সরবরাহে দেরি হয়েছে। এজন্য ক্রেতাদের বিশেষ ছাড়ও দিতে হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে বিশ্ব জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। যুদ্ধের সাত মাসে দিনে দিনে হরমুজে জাহাজ চলাচল ক্রমশ কমেছে। এতে বিশ্বে জ্বালানি সরবারহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
তার ওপর সম্প্রতি হরমুজের প্রধান বিকল্প বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি মিশিলিয়া। সশস্ত্র এ গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বেশ বড় রকমের হুমকি তৈরি করেছে।
হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং ইয়েমেনে হুতিদের তৎপরতায় দুই পথেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
এতে তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ভারতকে বিকল্প উৎস ও দীর্ঘ সমুদ্রপথে বেশি খরচে তেল আনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও জ্বালানি ও গ্যাসের সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশে এলএনজির দাম বেড়েছে, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে।
পোশাকশিল্পে এ পরিস্থিতিটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক। কারণ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কর্মরত। দেশের মোট উৎপাদনেও এই খাতের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
ফলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কারখানা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
এরই মধ্যে সোমবার জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু পোশাক কারখানাগুলোর জন্য এর অর্থ হলো আরও বেশি উৎপাদন ব্যয়।
ঢাকার সাভারের একটি পোশাক কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নাকিব জানিয়েছেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের উৎপাদন ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। মাসিক জ্বালানি ব্যয়ও প্রায় ৫০ লাখ টাকা বেড়েছে। তার মতে, প্রতিষ্ঠানটি বাড়তি ব্যয় সামলাতে পারলেও দেশের সব কারখানার পক্ষে তা সম্ভব নয়।
পোশাক রপ্তানিকারক শহিদুল্লাহ আজিমও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পোশাক ব্যবসায় মুনাফার পরিমাণ এমনিতেই কম। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সেই মুনাফার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি জানান, একটি কানাডীয় ক্রেতা আগে ২৫ হাজার পোশাক কেনার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার পোশাকের ক্রয়াদেশ দিয়েছে।
এখানকার একটি পোশাক কারখানার চিত্র অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছে। এর একটি বড় অংশ আসে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। ফলে দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা যেখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানটি এখনো তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। কারখানাটিতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
এ কারখানার মতো আরও বেশ কয়েকটি পোশাক প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি শিল্পপর্যায়ের ব্যাটারি স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে। বিদ্যুৎ বা অন্য জ্বালানি উৎস সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও এতে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হতে পারে।
এখানে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোশাক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বাংলাদেশের উৎপাদকদের জন্য বাড়তি ব্যয় ও অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ ক্রেতাদের অন্য দেশমুখী করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে সংকট সামাল দিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য তা কঠিন।
তাই জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে পোশাকের উৎপাদন ও সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।



