কামড়-আঁচড়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ময়মনসিংহ নগরে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই নগরীর সূর্যকান্ত (এস কে) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজার ৭১৭ জন। গত বছর একই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ১৪ জন। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও কুকুরকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ। ফলে প্রাণীর কামড়-আঁচড়ের পর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, চিকিৎসাব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কুকুর-বিড়ালের কামড়-আঁচড়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেয়ালের কামড়ও। ২০২৫ সালে নগরীর এস কে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২৯ হাজার ১৪ জন। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে একই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২৭০ জন। ২০২৩ সালে সরকারি এই চিকিৎসাকেন্দ্রে আক্রান্ত রোগী এসেছিলেন প্রায় ১৯ হাজার।
তবে এই হিসাব শুধু সরকারি হাসপাতালের। বাইরে থেকে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিরা অবশ্য থাকছেন এ হিসাবের বাইরে। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য বলছে, কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ অনেক দিন ধরেই।
জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তি সংক্রমিত হয় র্যাবিস ভাইরাসে। ধীরে ধীরে এ ভাইরাস প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে গলবিল ও খাদ্যনালির মাংসপেশির কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুও আক্রান্ত হয়। সাধারণত কামড়ানোর দু-তিন মাসের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে এ সময়সীমা এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও হতে পারে।
জলাতঙ্ক আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখলে ভয় পায়। কষ্ট হয় পানি বা খাবার গিলতে। পিপাসা পেলেও পানি দেখলেই আতঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়ে। আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে এ ভীতি আরও বেড়ে যায়। তাদের আচরণেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। খিঁচুনিসহ মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিঃসৃত হয়। বিনা প্ররোচনায় অন্যকে আক্রমণ বা কামড় দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসা না পেলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে।
তবে চিকিৎসকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টিকা দিলে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ময়মনসিংহ নগরীতে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয় এস কে হাসপাতালে। এটি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরই আওতাধীন। হাসপাতালের তথ্যমতে, প্রতিদিন কুকুর-বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত অন্তত ১০০ জন আসেন এখানে।
হাসপাতালটির চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৮৭৬ জন। বাকি ৮ হাজার ৮৪১ জন বিড়াল বা অন্য প্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৮ হাজার ৫৫৫ জন। আর নারী ৬ হাজার ১৬২ জন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় হাসপাতালে। তার হলে থাকা বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। নগরীর বাঘমারা এলাকার রাহাত নামে এক বাসিন্দার হাতেও আঁচড় দিয়েছে বিড়াল। তিনিও এসেছেন চিকিৎসার জন্য। কাশেম মিয়া নামে আরও একজন এসেছেন হাসপাতালে। পুলিশ লাইনস এলাকার এই বাসিন্দা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন।
এস কে হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক প্রজ্ঞানন্দ নাথ বললেন, ‘কুকুরের কামড় বা বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।’ তিনি এ ব্যাপারে নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ আক্রান্ত হলে ভ্যাকসিন নেওয়ার কথাও বলেছেন। সময়মতো ভ্যাকসিন নিলে ভয়ের কোনো কারণ নেই— আশ্বস্ত করেন এই চিকিৎসক।
নগরে কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বেশ উদ্বিগ্ন বাসিন্দারা। তারা বলছেন, কোনো কোনোটির আচরণ অস্বাভাবিক। হঠাৎ করেই কামড় দিচ্ছে পথচারীদের। অনেকে বাসায় শখ করে বিড়াল পোষেন। সেই বিড়ালও কখনো কখনো বাসার লোকজনের গায়ে আঁচড় দিচ্ছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এইচ কে দেবনাথের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘নগরীতে এখন কোনো কুকুর মারা হয় না। ভ্যাকসিন দেওয়ার বিষয়টি প্রাণিসম্পদ বিভাগ করে থাকে। আমরা সহযোগী হিসেবে কাজ করি।’ তবে তিনি দাবি করেছেন, কোনো কুকুর পাগল হয়ে গেলে সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম জানালেন, বর্তমানে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কোনো কার্যক্রম তাদের চালু নেই। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।







