এক দিনেই কোটি টাকার বিল, নবীনগরের সড়ক প্রকল্পে বড় দুর্নীতি!

ছবি: আগামীর সময়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে প্রকৌশলীকে মারধরের ঘটনায় আলোচিত ঠিকাদার লোকমান হোসেনের বিরুদ্ধে এবার উঠেছে বড় ধরনের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ। কাজ শেষ না করেই কোটি টাকার বিল উত্তোলন, কার্যাদেশ পাওয়া মাত্র এক দিনের মাথায় এক কোটি টাকার বেশি বিল তুলে নেওয়া এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগে জেলা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, নবীনগর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স লোকমান এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই কাজ অসমাপ্ত রেখেই বরাদ্দের অধিকাংশ অর্থ উত্তোলন করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার আলীয়াবাদ থেকে গোপালপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে। তবে পাঁচ কিলোমিটার সড়কের মাত্র তিন কিলোমিটার কাজ করেই এরই মধ্যে ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে জীবনগঞ্জ বাজার থেকে শাহপুর সড়ক প্রকল্পে। ১০ কোটি ৩৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয় গত ২ মার্চ। অথচ পরদিন ৪ মার্চই তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী কাজ চলমান দেখিয়ে ১ কোটি ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩৯ টাকার বিল পরিশোধের সুপারিশ করেন। পরে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পুরো অর্থ তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে বিল পরিশোধ হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কোটি টাকার কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের ঘটনা নজিরবিহীন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে চলমান কাজ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সড়কের পাশে পুকুরপাড় এলাকায় কোনো রিটার্নিং দেয়াল ছাড়াই মাটি ফেলা হয়েছে। এতে সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাসেম বলেছেন, ‘সংস্কারের নামে রাস্তাটা চলাচলের অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে।’ রিকশাচালক আরিফ মিয়া জানালেন, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
রতনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুল মান্নান বলেছেন, ‘রোজার পর থেকেই কাজ বন্ধ ছিল। রিটার্নিং দেয়াল ছাড়া মাটি ফেলায় যেকোনো সময় রাস্তা ধসে পড়তে পারে।’
এর আগে মেরকুটা বাজার থেকে শিবপুর সড়ক প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে ঢাকা থেকে আসা এলজিইডির প্রতিনিধিদলের সামনেই উপজেলা প্রকৌশলী তরিকুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ঠিকাদার লোকমান হোসেন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় মামলার পর থেকেই তিনি পলাতক।
এ বিষয়ে লোকমান হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
নবীনগর উপজেলা প্রকৌশলী ফেরদৌস আলম বলেছেন, ‘আমি যোগদানের পর বিষয়গুলো নজরে এসেছে। এক দিনের ব্যবধানে কীভাবে ১ কোটি টাকার কাজ দেখানো হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলীকে শোকজ করা হয়েছে।’
‘আলীয়াবাদ-গোপালপুর সড়ক প্রকল্প নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ওই সড়কটি নবনির্বাচিত এক সংসদ সদস্যের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ায় সেখানে সামান্য কাজ করেই অধিকাংশ বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’— যোগ করেন তিনি।




