মাধ্যমিকের গণ্ডিতেই আটকে যাচ্ছে স্বপ্ন!

ছবি: এআই
হাজারো স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করলেও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারছে না অনেক শিক্ষার্থী। রংপুর অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ঝরে পড়ার প্রবণতা। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এ হার আরও বেশি। মাধ্যমিকে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেও অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে বসার আগেই নেমে পড়ছে জীবিকার সংগ্রামে।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের অল্প বয়সেই ধরতে হচ্ছে সংসারের হাল। ফলে অনেকের শিক্ষাজীবন থেমে যাচ্ছে মাঝপথেই। অন্যদিকে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা। আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো না হওয়ায় কেউ কেউ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকেও থাকছে বিরত।
দেশে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ২১ এপ্রিল। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে রংপুর বিভাগে প্রথম দিন বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ১৭৮ জন পরীক্ষার্থী। পরের পরীক্ষাগুলোতে এই সংখ্যা বেড়েছে ক্রমেই।
প্রথম পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীও পরের পরীক্ষাগুলোতে অনুপস্থিত ছিল। ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় নতুন করে ১২৩ জন পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে আসেনি। ২৬ এপ্রিলের ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষায় আরও ২৮৬ জন ছিল অনুপস্থিত। ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৩৯ জন।
১২ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১১টি বিষয়ের পরীক্ষায় মোট অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনে দাঁড়িয়েছে। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বোরহান উদ্দিনের এসএসসি পরীক্ষার দৈনিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় রংপুর বিভাগের আট জেলায় মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ৪১ হাজার ২২০ জন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন পরীক্ষার্থী ঝরে পড়েছে বা অনুপস্থিত রয়েছে। বিভাগে এবার ২৮৩টি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রথম দিনে অনুপস্থিতির হার ছিল শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। দ্বিতীয় দিনে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশে। তৃতীয় দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হার হয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১২ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৪ শতাংশে।
এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে রংপুরে ১৯৪ জন, গাইবান্ধায় ২১৮, নীলফামারীতে ১২৩, কুড়িগ্রামে ১২০, লালমনিরহাটে ১১২, দিনাজপুরে ২৫৫, ঠাকুরগাঁওয়ে ১২০ এবং পঞ্চগড়ে ৯৭ জন রয়েছে।
গত বছরের তুলনায় এবার অনুপস্থিতির সংখ্যা কিছুটা কম। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ৩৪১ জন পরীক্ষার্থী। ওই বছর মোট পরীক্ষার্থী ছিল দুই লাখ ৪৪৪ জন, যার মধ্যে দুই হাজার ২৬০ জন অনুপস্থিত ছিল। এ ছাড়া ২০২৩ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল দুই লাখ দুই হাজার ৪৬২ জন। এর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল দুই হাজার ৯৭১ জন। ২০২২ সালে এক লাখ ৭৬ হাজার ৮৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল দুই হাজার ২৬৯ জন।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন থাকে বাবা-মায়ের। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই স্বপ্ন অনেকের ক্ষেত্রেই পূরণ হয় না। অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেমে যাচ্ছে মাধ্যমিক পর্যায়েই।
সূত্রটির দাবি, আগের তুলনায় ঝরে পড়ার হার কিছুটা কমলেও সমস্যা এখনো উদ্বেগজনক। প্রতিবছর এই বোর্ডের অধীনে রংপুর বিভাগের আট জেলা থেকে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করে। কিন্তু দুই বছর কলেজে পড়াশোনা করার পরও ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। নানা কারণে তারা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে হচ্ছে ব্যর্থ।
সচেতন মহলের মতে, পরীক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য, প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষায় খারাপ ফল এবং অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পার্শ্ববর্তী সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তিন শতাধিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত রয়েছে চারজন। এর মধ্যে গুলালবুদাই উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী রয়েছে।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন জানান, ১০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ওই ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। তারপরও তাকে পরীক্ষা দিতে বলা হয়েছিল, দেয়নি। পরীক্ষা না দেওয়া তালুক হাবু উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রুবেল মিয়ার বাড়িতে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তার বাবা একরামুল হক বলেছেন, ‘অভাবের সংসারোত আর কুলান যাওচে না, পড়াশনা করাইম কী দিয়া! বেটায় (ছেলে) কামাই কইরবার ঢাকাত গেইচে।’
বিষয়টি নিশ্চিত করে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক। জানালেন, ফরম পূরণ করেছিল রুবেল মিয়া, কিন্তু পরীক্ষা দিচ্ছে না। পরীক্ষা শুরুর আগে যোগাযোগ করেও বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়নি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, ‘স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে বা উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর অনেক পরিবারই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ জোগান দিতে পারে না। কখনো আবার অমনোযোগী শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়। প্রধানত আর্থ-সামাজিক কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থী কমে যাচ্ছে।’
‘অভিভাবকরা মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন এবং পরীক্ষার আগেই বিয়ে দেন। পারিবারিক দুর্যোগের কারণে ছেলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় কাজ করতে বাধ্য হয়। তাদের কাছে পড়াশোনার চেয়ে সংসার চালানোই জরুরি হয়ে পড়ে। এ সমস্যার সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।’
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বোরহান উদ্দিন জানালেন, প্রত্যেক বিষয়ের পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। চলতি এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭৮ জন।
যেখানে গত বছরের এই পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ৩৪১ জন। এসএসসি পাসের পর সব শিক্ষার্থীই এই বোর্ডের আওতায় ভর্তি হয় না। তা ছাড়া অনেকে নানা কারণে লেখাপড়া না করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। তবে আগের চেয়ে ঝরে পড়ার হার অনেকটা কমে এসেছে। এর পরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।




