গজারিয়ায় এক মাসে ২৫ সংঘর্ষে ৯ মামলা, অধিকাংশ সালিশে নিষ্পত্তি

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানা। ছবি : আগামীর সময়
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও মারামারির ঘটনা বেড়েই চলেছে। গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি এমন ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তবে থানায় মামলা হয়েছে মাত্র ৯টি।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দাবি, অধিকাংশ ঘটনাই স্থানীয়ভাবে সালিশ-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধ কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সর্বশেষ গত ২৯ অক্টোবর রাত পৌনে ১০টার দিকে টেংগারচর ইউনিয়নের বড় ভাটেরচর গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিনের অনুসারীদের সঙ্গে বর্তমান ইউপি সদস্য মাহফুজুর রহমান রিপনের অনুসারীদের এই সংঘর্ষ হয়। এতে টেঁটাবিদ্ধসহ উভয় পক্ষের পাঁচজন আহত হন।
একই দিন রাতে বাউশিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া ফরাজীকান্দি গ্রামে বসতবাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ক্যানসারে আক্রান্ত এক নারীসহ একই পরিবারের চারজন আহত হন।
এর আগে ২৫ অক্টোবর রাতে পূর্ববিরোধের জেরে ফরাজীকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার (৩৬) নামের এক নারীকে পিটিয়ে এক হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে।
২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় ভবেরচর ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামে বাদলের দোকানের সামনে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহসিন মুন্সি ও একই এলাকার গিয়াস উদ্দিনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পরে গিয়াস উদ্দিন বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর করা হয়েছে বলে জানান। এ খবর শুনে তার ভাই ও ভাতিজারা লাঠিসোঁটা নিয়ে মহসিন মুন্সির বাড়িতে হামলা করতে গেলে ইউপি সদস্য ইলিয়াস প্রধানের ছেলে উভয় পক্ষকে থামানোর চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় গিয়াস উদ্দিনের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে ইউপি সদস্যের ছেলেকে মারধরের অভিযোগ ওঠে।
খবর পেয়ে ইউপি সদস্য ইলিয়াস প্রধান ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়রা বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেন। পরে ২৩ অক্টোবর বিচার-সালিশ বসলে উভয় পক্ষের মধ্যে ফের সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিচার-সালিশে অংশ নেওয়া পঞ্চায়েতের দুই সদস্যসহ পাঁচজন আহত হন।
২১ অক্টোবর বাউশিয়া ইউনিয়নের পুরান বাউশিয়া গ্রামে শিশুদের মধ্যে বালু ছোড়াছুড়িকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জেরে দুই দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ব্যাংক কর্মচারী শাহ কামাল পাঠান রতন (৬৫) গুরুতর আহত হন।
এ ছাড়া ১৮ অক্টোবর হোসেন্দী ইউনিয়নের ইসমানিরচর গ্রামে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় একই পরিবারের চারজন আহত হন।
আহতরা হলেন- প্রয়াত আকরাম আলী সরকারের ছেলে দ্বীল মোহাম্মদ, তাঁর স্ত্রী রোকসানা বেগম এবং তাঁদের দুই মেয়ে রিমা আক্তার ও ইভা আক্তার।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ১০৩টি গ্রামে বিভিন্ন কারণে বিরোধের ঘটনা ঘটছে। তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু করে জমিজমা, বাড়ির সীমানা, শিশুদের ঝগড়া ও পুরোনো শত্রুতাও অনেক সময় সংঘর্ষের কারণ হয়ে উঠছে।
মানবাধিকার কর্মী এস এম নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, হামলা, সংঘর্ষ ও ঝগড়া-বিবাদের কারণে অনেক সময় উপজেলার নানা উন্নয়ন ও সাফল্যের খবর আড়ালে পড়ে যায়।
তার ভাষ্য, কারণে-অকারণে ঝগড়া-বিবাদ থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে সামাজিক ও সামগ্রিক উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বালুয়াকান্দি ডা. আব্দুল গফ্ফার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মোস্তফা কামাল শিকদার বলেছেন, এলাকায় ঝগড়া-বিবাদের ঘটনা বেড়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অন্যরা ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটানোর আগে অন্তত একবার পরিণতির কথা ভাবত।গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নকীব আকরাম জানিয়েছেন, গত এক মাসে মারামারির ঘটনায় থানায় ৯টি মামলা হয়েছে। তার ভাষ্য, অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় না এসে গ্রামের মধ্যেই উভয় পক্ষের সমঝোতায় বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলেন।



