ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশনে প্রকাশিত গবেষণা
উত্তরাঞ্চলে দামের চাপে বদলাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ— প্রবাদটি মিথের মতো মনে হলেও একসময় গ্রামীণ বাংলার চিরায়ত রূপ ছিল এটি। গ্রামের মানুষের পাতে নিয়মিত থাকত মাছ, ডিম, শাকসবজি, ডাল, দুধ আর মৌসুমি ফল। নিজের জমির ফসল, পুকুরের মাছে কিংবা বাগানের ফলে পূরণ হতো পরিবারের পুষ্টির বড় অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। গ্রামের সিংহভাগ মানুষকে কিনে খেতে হয় বেশিরভাগ খাবার। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে খাবারের ধরন ও মানে কাটছাঁট করতে হচ্ছে তাদের। ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাসও।
উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুরের গ্রামীণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরিচালিত আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক তথ্য। ওই গবেষণা বলেছে, খাদ্যের অভাব নয়, বরং পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতাই মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ।
‘Rural Diets Under Pressure: Food Environments and Their Influence on Diets in South Asia’ শিরোনামে গত ৩ জুলাই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশন’-এ গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ মানুষের খাদ্যপরিবেশ, খাবারের সহজলভ্য, বাজারব্যবস্থা এবং মানুষের আর্থিক সক্ষমতা কীভাবে খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলছে সে বিষয়টি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই), ভারতের ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক গ্রোথ এবং নেপালের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে গবেষণাটি। গবেষক দলে ছিলেন আইএফপিআরআইয়ের আলকা চৌহান, স্যামুয়েল স্কট, পূর্ণিমা মেনন ও সুমন চক্রবর্তী, ভারতের উইলিয়াম জো এবং নেপালের নন্দ কুমার মহারাজন।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নির্বাচন করা হয় রাজশাহী ও রংপুরের গ্রামীণ এলাকা। এ দুই জেলার মোট দুই হাজার পরিবারকে জরিপের আওতায় আনা হয়।
একই পদ্ধতিতে ভারত ও নেপালের কয়েকটি এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে তিন দেশের ৯ হাজার ৭১১টি পরিবার এবং ১ হাজার ৬৪৬টি বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি হয়েছে ওই গবেষণার ফল।
গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ বাজারগুলোয় স্বাস্থ্যকর খাবারের তুলনায় কম দামের অস্বাস্থ্যকর খাবার বাড়ছে। বিস্কুট, চিপস, কোমলপানীয়, মিষ্টিজাতীয় খাবারসহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার এখন পাওয়া যায় গ্রামের ছোট ছোট দোকানেও। অন্যদিকে মাছ, ডিম, দুধ, ফল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবারের উচ্চমূল্যের কারণে তা চলে যাচ্ছে অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকার বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনকে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গবেষকরা বলছেন, মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছে বাজারে এসব খাবারের অভাবে নয়; বরং মূল সমস্যা হচ্ছে দাম। অনেক পরিবার সীমিত আয় দিয়ে সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে কম খরচের খাবার বেছে নিচ্ছে। এতে পেট ভরলেও শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গ্রামের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকায় সহজেই মিলছে প্রক্রিয়াজাত খাবার। এসব খাবার সহজলভ্য ও কম দামের হওয়ায় হওয়ায় নিম্ন এবং সীমিত আয়ের মানুষ পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় এগুলোর দিকে ঝুঁকছেন বেশি। ফলে অনেক পরিবারে পুষ্টিকর খাবার নয়, বরং কম দামের খাবারই হয়ে উঠছে প্রধান ভরসা।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত প্রধান খাবারের বাইরে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত হালকা খাবার খান।
দামের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পেছনে বিজ্ঞাপনেরও বড় ভূমিকা দেখেছেন গবেষকরা। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন খাবারের বিজ্ঞাপন শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষকে আকৃষ্ট করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক শাহজাদা সেলিম এ বিষয়ে বলেছেন, ‘দেশে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে স্থূলতা, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বিপাকজনিত রোগ দ্রুত বাড়ছে।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হরমোন ও বিপাকতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ এইচ এম আক্তারুজ্জামান বললেন, ‘নিম্নমানের বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যেও স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও যকৃতে চর্বি জমার সমস্যা বাড়ছে। অল্প বয়সে এসব সমস্যা দেখা দিলে ভবিষ্যতে হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং জটিল যকৃতের রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’




