১৩ কোটি টাকার সেতুতে উঠতে লাগে মই
- সরকারের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই বানালেন মই, ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন স্থানীয়রা

ছবি: আগামীর সময়
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি সেতু। কিন্তু সেই সেতুতে ওঠার কোনো সংযোগ সড়ক নেই। ফলে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, মানুষের স্বাভাবিক চলাচলও সম্ভব নয়। অবশেষে সরকারের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয়রাই তৈরি করেছেন একটি বড় মই। সেই মই বেয়েই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষ।
এমনই চিত্র কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার গজালিয়া এলাকায় ঈদগাঁও খালের ওপর নির্মিত প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি সেতুর। প্রায় পাঁচ বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়কের অভাবে আজও জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি সেতুটি। এলাকাবাসীর কাছে কোটি টাকার এই উন্নয়ন প্রকল্প এখন উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং পরিকল্পনাহীনতার এক নির্মম উদাহরণ।
গত শনিবার (১৭ জুলাই) স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে সেতুতে ওঠা-নামার জন্য একটি বড় মই স্থাপন করেছেন। এর পর থেকেই সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই ঝুঁকি নিয়েই সেই মই বেয়ে সেতু পারাপার করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকার যেখানে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে পারেনি, সেখানে জনগণ নিজেরাই মই তৈরি করে চলাচলের ব্যবস্থা করেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় পাঁচ বছর আগে ঈদগাঁও খালের ওপর ৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৩ মিটার প্রস্থের এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় এখন পর্যন্ত এটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, সেতুটি চালু হলে ঈদগাঁও উপজেলার সঙ্গে পাহাড়ি জনপদ ঈদগড়, বাইশারী ও গর্জনিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তখন আর যাত্রীদের ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের ডাকাতি ও অপহরণের জন্য কুখ্যাত হিমছড়ি, ক্ষেত ও সাঁততরা ডালা এলাকা অতিক্রম করতে হবে না।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে ওই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে চলাচল করেন। বিকল্প এই সেতুটি চালু হলে লাখো মানুষ নিরাপদ, স্বল্প দূরত্বের এবং সময় সাশ্রয়ী একটি যাতায়াত পথ পাবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম ও আব্দুর রহিম বলেছেন, পরিকল্পনার দুর্বলতা, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং ঠিকাদারের দায়িত্বহীনতার কারণেই পাঁচ বছর ধরে সেতুটি অকেজো পড়ে আছে। এতে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়ে রয়েছে, অন্যদিকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
আরেক বাসিন্দা আজিজুল হক বলেছেন, ‘প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর ব্যবহার নিশ্চিত করতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে? কোনো প্রাণহানির পর কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?’
এলাকাবাসীর একটাই দাবি, দ্রুত সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক। এতে শুধু পাঁচ বছরের দুর্ভোগের অবসানই হবে না, বরং ঈদগাঁও, ঈদগড়, বাইশারী ও গর্জনিয়াসহ পাহাড়ি জনপদের লাখো মানুষের জন্য নিরাপদ, সহজ ও সময় সাশ্রয়ী যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘এই সেতু চালু করা এখন জনগণের প্রাণের দাবি। দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া প্রয়োজন।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য জুবায়েদ উল্লাহ জুয়েল জানিয়েছেন, সেতুর পশ্চিম পাশের সংযোগ সড়কের কিছু অংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর পড়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ায় প্রকল্পটি আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
এ বিষয়ে ঈদগাঁও উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আল মুইন শাহরিয়ার বললেন, সংযোগ সড়কের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় আগের টেন্ডার বাতিল করা হয়েছে। অবশিষ্ট কাজের জন্য নতুন টেন্ডার আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।




