বালু উত্তোলনে বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি
শ্রী হারাচ্ছে শ্রীমঙ্গল
- ২৮ কোয়ারির মধ্যে বৈধ মাত্র দুটি
- অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না তৎপরতা
- হুমকির মুখে ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। সবুজ পাহাড়, চা বাগান আর পাহাড়ি ছড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এ জনপদের পরিচয়ের বড় অংশ। কিন্তু সেই সৌন্দর্য এখন হুমকির মুখে পড়েছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে। উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া, নদী ও কৃষিজমিসংলগ্ন এলাকা থেকে চলছে বালু লুট। ২৮টি বালুমহাল ও কোয়ারির মধ্যে বৈধ ইজারা রয়েছে মাত্র দুটির। বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি ইজারাবিহীন। এই সুযোগে বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বালু উত্তোলনকারী চক্র। বিভিন্ন সময় প্রশাসনের ১৮টি অভিযান, জরিমানা, কারাদণ্ড ও মামলা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই তৎপরতা। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব, অন্যদিকে বিপন্ন হচ্ছে পাহাড়ি ছড়া, কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক ও জনবসতি।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, শ্রীমঙ্গলে ২৮টি বালুমহাল ও কোয়ারি রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ বালুমহাল দুটি— গোপলাছড়া ও শিয়ালছড়া। এই দুটি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি দীর্ঘদিন ধরে ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আইনি জটিলতার কারণে সেগুলো ইজারাবিহীন রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই সুযোগে এসব এলাকায় বালু উত্তোলন করছে বিভিন্ন চক্র।
বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা অবশ্য থেমে নেই। চলতি বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৬টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা। সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বরের আরও দুটিসহ অভিযানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮টিতে।
অভিযান দুটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম। তিনি বললেন, অভিযানের সময় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জরিমানা বা কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এর আগে সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ, কালাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ভেকু মেশিন এবং অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ ও ধ্বংস করেছে প্রশাসন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অভিযান শেষ হলেই আবারও শুরু হয় বালু উত্তোলন। ফলে প্রশাসনের ধারাবাহিক তৎপরতাও স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না।
বালু উত্তোলনের প্রভাব শুধু পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বালু পরিবহনকে কেন্দ্র করে ঘটছে সংঘর্ষ, হামলা ও সড়ক দুর্ঘটনা। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়িচাপায় অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটমের চালকসহ ছয়জন আহত হন। এ ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন।
শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া। এসব ছড়া গিয়ে মিলেছে হাইল হাওরে। বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতীছড়া, ভুড়ভুড়িয়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া ও গিলাছড়া উপজেলার পরিবেশ ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সদর, সিন্দুরখান, আশিদ্রোন, সাতগাঁও, ভূনবীর, মির্জাপুর ও কালাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ছড়া থেকে নিয়মিত বালু তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া সদর, কালীঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানেও ছোট পরিসরে চলছে বালু উত্তোলন।
পরিবেশকর্মী তাপস দাশের মতে, পাহাড়ি ছড়া থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে তীর ভাঙন, কৃষিজমির ক্ষয় এবং সড়ক ও সেতুর ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিতে পড়তে পারে আশপাশের বসতবাড়িও।
অবশ্য শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রতিরোধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিজমি সুরক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ আইন অমান্য করে বালু উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



