বিলুপ্তির পথে মাটির মটকা

ছবি: আগামীর সময়
একসময় কুমিল্লার লাকসামের প্রায় প্রতিটি গৃহস্থবাড়িতে দেখা যেত মাটির তৈরি বড় পাত্র ‘মটকা’ বা ‘মটকি’। এতে সংরক্ষণ করা হতো চাল, বীজ ও শুকনো খাবার। পানি রাখলে তা ঠান্ডাও থাকত। প্লাস্টিকের পাত্রের ব্যবহার বাড়ায় কালের বিবর্তনে এখন হারিয়ে যেতে বসেছে সেই মটকা। কোথাও দুয়েকটি থাকলেও সেগুলো পড়ে রয়েছে অব্যবহৃত অবস্থায়।
লাকসাম উপজেলার গোবিন্দপুর, উত্তরদা, আজগরা, মুদাফরগঞ্জ, কান্দিরপাড় ও লাকসাম পূর্ব ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে খোঁজ নিয়ে চার-পাঁচটি বাড়িতে মটকা পাওয়া গেছে। তবে এগুলোর কোনোটিই এখন আর ব্যবহার হচ্ছে না।
গোবিন্দপুর ইউনিয়নের বেতিহাটি গ্রামের কৃষক মো. ছিদ্দিকুর রহমানের বাড়িতে ঘরের পাশে দুটি মটকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের দাদা-নানাদের সময়ে এসব মটকার প্রচলন ছিল বেশি। বীজ ধান, গম, সরিষা, তিলসহ বিভিন্ন বীজ এবং চাল বা শুকনো খাবার এতে রাখা হতো।
বেতিহাটি গ্রামের কৃষক মো. রুহুল আমিন, লক্ষ্মীপুরের মো. দেলোয়ার হোসেন, আজগরা ইউনিয়নের নাওটি গ্রামের মো. শাহাবুদ্দিন ও উত্তরদা ইউনিয়নের ঠেঙ্গারপাড়ের রবিউল হক জানিয়েছেন, তাদের সময়েও অনেক বাড়িতে বাঁশের তৈরি ধানের গোলা এবং মাটির মটকা ছিল। একটি গোলায় ৪০-৫০ মণ পর্যন্ত ধান রাখা যেত। এখন মটকার পাশাপাশি ধানের গোলাও প্রায় হারিয়ে গেছে।
দৌলতগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী ও ধামৈচা গ্রামের মৃৎশিল্পী দুলাল চন্দ্র পাল জানিয়েছেন, ১৯৯০-এর দশকেও তাদের গ্রামের অধিকাংশ পরিবার মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাসন, মটকা ও অন্যান্য পাত্র তৈরি করত। এখন কেউ আর সেভাবে এসব তৈরি করেন না। বাইরে থেকে এনে বিক্রি করতে হয়।
একই গ্রামের পার্থ পাল জানিয়েছেন, লাকসামে তাদের গ্রামেই একসময় মটকা ও মাটির বিভিন্ন পাত্র তৈরি হতো। পরিবারের সদস্যরা এসব তৈরি করে হাট-বাজারে এবং নৌকায় করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে বিক্রি করতেন। এখন প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা বাড়ায় সে পেশা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কুমিল্লার আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বললেন, একসময় মটকা বা মটকির ব্যাপক প্রচলন ছিল। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং প্লাস্টিকের পাত্রের ব্যবহার বাড়ায় এগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়।
তিনি বলেছেন, প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বাঁশ-বেত, কাঠ, কুটিরশিল্প ও মৃৎশিল্পের দিকে নজর বাড়ালে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।



