ইতিহাসের সিন্দুক হাতে সেলিম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টাঙ্গাইল পৌরসভার কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন সেলিম। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন এক দুর্লভ ও ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। তার সংগ্রহে ঠাঁই পেয়েছে জিম্বাবুয়ের সর্বোচ্চ ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট, হংকংয়ের ১ সেন্টের সর্বনিম্নমানের নোট এবং ১৯১২ সালে রাশিয়ায় মুদ্রিত সবচেয়ে বড় আকৃতির ব্যাংক নোট। এ ছাড়া তার সংগ্রহে আছে বিশ্বের ১৭২টি দেশের মুদ্রা, প্রাচীন বেলচা ও ছুরি মুদ্রা। আছে পশ্চিম আফ্রিকায় দাস কেনাবেচায় ব্যবহৃত ব্রেসলেট মানি এবং কড়িও।
অটোগ্রাফ
স্কুলজীবনে সহপাঠীর কাছে ডাকটিকিটের সংগ্রহ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সেলিম। পরে নিজেই শুরু করেন অটোগ্রাফ সংগ্রহ। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তৎকালীন প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর অটোগ্রাফ পান। সেখান থেকেই বরেণ্য ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ জমানোর অদম্য ইচ্ছা তৈরি হয়।
সেলিমের ভাষ্য, বিন্দুবাসিনী স্কুলে পড়ার সময় একটা অনুষ্ঠানে এলেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ। তার একটা অটোগ্রাফ নিতে আমাকে পাঠানো হয়। স্টেজে গিয়ে সালাম দিতেই ইব্রাহিম খাঁ জানতে চাইলেন, কোন ক্লাসে পড়ি? বললাম, সপ্তম শ্রেণি। স্যার বললেন, তোমার বইয়ে আমার একটি গল্প আছে। সেটি পড়েছ? আমি বললাম, জি স্যার। তিনি দুটি লাইন শুনতে চাইলেন। বললাম। এরপর অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য খাতা-কলম এগিয়ে দিলাম। তিনি আমার নাম লিখে দিলেন। কিন্তু যে আমাকে অটোগ্রাফ নিতে পাঠিয়েছিলেন তিনি মনঃক্ষুণ হলেন।
তবে বিষয়টি এখানেই থেমে ছিল না। ১৯৯৩ সালের কথা। মাদার তেরেসার অটোগ্রাফ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা সেলিমের। ছুটে যান কলকাতায় ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’র কার্যালয়ে। সেখানে পৌঁছেই বাধার মুখে পড়তে হলো তাকে। জানানো হলো, মাদার তেরেসা স্থানীয়দের সঙ্গে দেখা করেন না। তখন তাদের বুঝিয়ে বললেন, ‘আমি ভারত থেকে আসিনি, বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’
এরপর পরদিন যেতে বলা হলো তাকে। বসতে দেওয়া হয় ভেতরের একটি হলরুমে। ওখানে আগে থেকেই অনেক বিদেশি অতিথি অপেক্ষা করছিলেন।
সেলিম বলছিলেন, ‘আমিও তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। একটু পর আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন মাদার তেরেসা। সব বিদেশি অতিথি সারিবদ্ধভাবে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে লাগল। তিনি সবার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতে থাকলেন। আমি ইচ্ছা করেই সবার শেষে লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। যখন আমার পালা এলো, আমি ইতস্তত না করে নিজের পরিচয় দিলাম এবং অটোগ্রাফের জন্য খাতাটি তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। তিনি মুচকি হেসে খাতায় অটোগ্রাফ দিলেন, তারপর হাত নেড়ে ভেতরে চলে গেলেন।’
পরে নেলসন ম্যান্ডেলা, রোনাল্ড রিগ্যান, কফি আনান, এডমন্ড হিলারি, সফিউদ্দিন আহমেদ ও ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরল স্বাক্ষর জমা হয় তার ঝুলিতে।
প্রাচীন মুদ্রা
অটোগ্রাফ সংগ্রহের পাশাপাশি সেলিম বিভিন্ন দেশের ও যুগের মুদ্রা সংগ্রহ শুরু করেছিলেন। এভাবেই তার সংগ্রহশালায় যুক্ত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মূল্যমানের ব্যাংক নোট— জিম্বাবুয়ের ‘১০০ ট্রিলিয়ন ডলার’। ২০০৮ সালে জিম্বাবুয়েতে তীব্র মুদ্রাস্ফীতির কারণে ঐতিহাসিক এই নোটটি বাজারে ছাড়তে হয়েছিল।
তার সংগ্রহে আরও আছে পৃথিবীর অন্যতম সর্বনিম্ন মানের নোট, যা ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত হংকংয়ে প্রচলিত ছিল। এর মূল্যমান ১ সেন্ট। এ ছাড়া তার ঝুলিতে আছে ১৯১২ সালে রাশিয়ার তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইজের (১১ ইঞ্চি বাই ৫ ইঞ্চি) একটি ব্যাংক নোট, যা তিনি ২০১৯ সালে সংগ্রহ করেন।
প্রাচীন মুদ্রার ক্ষেত্রেও তার সংগ্রহ বেশ সমৃদ্ধ। এতে স্থান পেয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১০৪৬ থেকে ২৫৬ সাল পর্যন্ত চীনের ঝাউ রাজবংশের প্রচলিত ‘স্পেড’ বা বেলচা মুদ্রা এবং খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ২০০ সালের ‘ছুরি মুদ্রা’। রয়েছে ১৬০০ ও ১৭০০ শতাব্দীতে পশ্চিম আফ্রিকার হাউশা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ম্যানিল্লা’ বা ব্রেসলেট মুদ্রা, যা মূলত সেকালে দাস কেনাবেচায় ব্যবহৃত হত।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলায় বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত মালদ্বীপের সামুদ্রিক শামুকের খোলস—‘কড়ি’ও সেলিমের সংগ্রহশালাকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীন সেই কড়ির গণনাপদ্ধতি ছিল—৪ কড়ি = ১ গণ্ডা, ৫ গণ্ডা = ১ বড়ি, ৪ বড়ি = ১ পন, ১৬ পন = ১ কাহন এবং ১০ কাহন = ১ টাকা। এসব দুর্লভ ও ঐতিহাসিক মুদ্রার পাশাপাশি তার এই সংগ্রহশালায় বিশ্বের ১৭২টি দেশের ব্যাংক নোট আছে।
তিনশ টেলিফোন
অটোগ্রাফ ও মুদ্রার পর ২০০৬ সাল থেকে শুরু হয় পুরনো টেলিফোন সংগ্রহের ঝোঁক। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সেলিমের সংগ্রহশালায় যুক্ত হয়েছে ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যবর্তী সময়ের তিন শতাধিক বিরল টেলিফোন সেট। এর মধ্যে রয়েছে ক্যান্ডেলস্টিক, মেরিন, রোটারি, মাইনিং ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালসহ বিশ্ব জুড়ে ব্যবহৃত নানা প্রযুক্তির টেলিফোন।
টেলিফোন সংগ্রহের এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। কোন যুগে কী ধরনের টেলিফোন তৈরি হতো এবং কোথায় তা পাওয়া যাবে— এসব তথ্য খুঁজে বের করতেই তার বছরের পর বছর কেটে গেছে। এই সংগ্রহের নেপথ্যে রয়েছে একটি আবেগঘন স্মৃতিও, যা আজও তার হৃদয় নাড়া দেয়। একদিন পুরনো দিনের একটি অ্যান্টিক টেলিফোনের খোঁজ পান তিনি। ছবিটি দেখেই তার মন কাড়ে এবং সংগ্রহশালায় যুক্ত করার তীব্র ইচ্ছা জাগে। বিক্রেতা সেটির দাম চান দুই হাজার ২০০ টাকা।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তার পকেটে ঠিক ততটুকুই টাকা ছিল, যা দিয়ে পরিবারের জন্য চাল কেনার কথা। চাল না কিনলে পুরো পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হতো। তবে সংগ্রহের প্রতি দুর্নিবার ভালোবাসার কাছে পারিবারিক প্রয়োজন হেরে যায়; চাল না কিনে তিনি সেই টাকায় টেলিফোনটি কিনে ফেলেন। এই একটি সিদ্ধান্ত ও তার অদম্য নেশাই তাকে আজ তিন শতাধিক বিরল টেলিফোনের সংগ্রাহক বানিয়েছে।
এ পর্যন্ত শুধু এসব টেলিফোন কিনতেই তার খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। আর সব মিলিয়ে তার সম্পূর্ণ সংগ্রহশালার মূল্যমান অন্তত ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।সেলিমের দুশ্চিন্তা
এই দীর্ঘ পথচলায় পরিবারের সমর্থন পাননি সেলিম। শুরুতে স্ত্রী বেশ বিরক্ত বোধ করতেন। কারণ সব জিনিসপত্র শোবার ঘরের বিছানার আশপাশেই রাখা হতো। স্ত্রী প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতেন, ‘পুরনো আমলের এসব অকেজো জিনিস দিয়ে কী হবে? শুধুই শোবার ঘর বোঝাই করে অগোছালো করে রাখা!’
পরে একরকম বাধ্য হয়ে তিনতলা ভবনের ছাদে একটি আলাদা রুম তৈরি করেন সেলিম। সংগ্রহশালা স্থানান্তর হয়। তার স্ত্রীর ক্ষোভ— এই বয়সে নিজের শরীরের যত্ন না নিয়ে সারা দিন কেন পুরনো জিনিসের পেছনে ছোটাছুটি করেন!
বয়সের ভার বিবেচনা করে সেলিম নিজেও এসব অমূল্য সংগ্রহ সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এগুলো তুলে দিতে পারলে তার এতদিনের কষ্টের সার্থকতা মিলবে। সে উদ্দেশ্যেই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা চান তিনি।
অবশ্য বর্তমান যুগে গুগলে সার্চ করলেই যেকোনো তথ্য সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু তার আমলে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের কাছে চিঠি লেখার সময় সঠিক ঠিকানা খুঁজে বের করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কাকে কীভাবে সম্বোধন করতে হবে— তা জানাও কঠিন ছিল। যেমন সৌদি আরবের বাদশাহকে চিঠি লেখার সময় ‘দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম’ বা ‘খাদেমুল হারামাইন’ সম্বোধন করতে হতো; আবার কানাডা কিংবা ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হতো ভিন্ন নিয়ম।
সত্তরোর্ধ্ব সেলিম মনে করেন, যেকোনো সৃষ্টিশীল সংগ্রহ মানুষকে আলোকিত করে। দুয়ার খুলে দেয় নতুন কিছু জানার।
এক নজরে সেলিম
১৯৫৫ সালে জন্ম হয় সংগ্রাহক সেলিমের। বাবা টাঙ্গাইল পৌরসভার কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা গোলাম সরোয়ার। সেলিম পড়াশোনা করেছেন শহরের সরকারি মডেল প্রাইমারি স্কুল, বিন্দুবাসিনী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ এবং করটিয়া সা’দত কলেজে।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। ঘরে বসেই রঙ-তুলি ও কলমে আঁকা তার বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে নিজের সংগ্রহশালায়।
টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খন্দকার নাজিম উদ্দিনের বলছিলেন, মফস্বল এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুরনো আমলের দুর্লভ সব জিনিস সংগ্রহ করছেন দুজন ব্যক্তি। ইসমাইল হোসেন সেলিম এবং মির্জা মাসুদ রুবেল। তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত এই ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাগুলোকে বড় পরিসরে আধুনিকায়ন করা, যাতে যুবসমাজ এ বিষয়ে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক এস এম ওবায়দুল হক নাসির জানাচ্ছিলেন, প্রাচীন যুগের নানা দুর্লভ সামগ্রী যেমন— পুরনো টেলিফোন, অটোগ্রাফ, ম্যাচ বক্স ও বিরল মুদ্রা এক জায়গায় করে সেলিম এক অসাধারণ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব তুলে ধরতে বিভিন্ন মেলায় তার সংগ্রহ প্রদর্শনের চেষ্টা করা হবে। সেলিমের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। এটি একটি নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। তার সংগ্রহশালাটি কীভাবে আরও সুন্দর করে ধরে রাখা যায়, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকব।






