বিপন্ন প্রাণী ‘বাংলা খেঁকশিয়াল’

নওগাঁর পাহাড়পুর এলাকা থেকে ছবিটি তুলেছেন সৌখিন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ও লেখক রানা মাসুদ
বিভিন্ন প্রজাতির খেঁকশিয়ালের মধ্যে বাংলা খেঁকশিয়াল একটা প্রজাতি। একে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। বাংলায় এর আরেক নাম হেড়ল। কয়েক বছরে এদের সংখ্যা কমে আসছে। তবে এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছেনি। সে কারণে আইইউসিএন (আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ) এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-২ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।
বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকে বলছেন, পৃথিবীতে বহু প্রজাতির খেঁকশিয়াল দেখা যায়। লাল শিয়াল, কাঁকড়াভূক খেঁকশিয়াল, বাংলা খেঁকশিয়াল, ধূসর খেঁকশিয়াল, ডারউইনের খেঁকশিয়াল ইত্যাদি। তবে কেউ কেউ বলছেন, মোট ৩৭টি প্রজাতির খেঁকশিয়াল পৃথিবীতে দেখা যায়। যার ১২ প্রজাতিই ‘প্রকৃত খেঁকশিয়াল’ হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক পর্যায়ে অতি সাধারণ খেঁকশিয়াল হিসেবে রয়েছে লাল শিয়াল (রেড ফক্স)। এরা খুবই ধূর্ত প্রকৃতির, যা অতি প্রাচীনকাল থেকেই উপকথায় বর্ণিত রয়েছে।
বাংলা খেঁকশিয়াল একটি মাঝারি আকৃতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্য ৪৫-৬০ সেন্টিমিটার এবং লেজ ২৫-৩৫ সেন্টিমিটার। কান দেহের তুলনায় বড়, মাথা সরু। লেজ দেহের অর্ধেকেরও বেশি লম্বা। আঙুলের ওপর ভর করে চলাফেরা করে। সামনের পায়ে আঙুল পাঁচটি ও পেছনে চারটি।
মৌসুম ও বয়সভেদে বাংলা খেঁকশিয়ালের বর্ণের তারতম্য আছে। পিঠ সাদা ডোরাসহ লালচে-ধূসর। দেহের পাশ পিঠের তুলনায় বেশি ধূসর। দেহতল সাদাটে। বুকের নিচের অংশ ও তলপেট ফ্যাকাশে লালচে-হলুদ কিংবা হালকা পীত-সাদা। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো অঙ্গটি হলো এর বড় ঝাঁকড়া লেজ। ধূসর হলেও লেজের উপরিভাগ লালচে, আগা কালো।
খেঁকশিয়াল ছোট্ট শিয়ালজাতীয় শ্বাপদভূক্ত প্রাণী। এ কারণে তারা অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণী শিকার করে জীবনধারন করে। ইঁদুর, ঘাসফড়িং, পাখি ও এদের ডিম এদের খাদ্য। এমনকি এরা বিভিন্ন ফলমূল খেয়ে থাকে। কখনো এরা গলিত পচা মাংসও খায়।
ক্যানিডে পরিবারভূক্ত প্রাণীদের মধ্যে খেঁকশিয়ালই সবচেয়ে ছোট সদস্য। প্রাণীটি কুকুর প্রজাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এরা খুব ধূর্ত, চঞ্চল ও দ্রুতবেগে দৌড়াতে সক্ষম। দলবদ্ধ হয়ে শিকারে বের হয় ও একত্রে থাকতে পছন্দ করে। তাদের ঘন, বিস্তৃত লেজ সহজেই দৃশ্যমান ও এর সাহায্যেই শনাক্ত করা সম্ভব। লেজের সাহায্যে সতর্ক সঙ্কেত পাঠাতে ও অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে।
বন্য পরিবেশে খেঁকশিয়াল ১০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু শিকারে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গড়পড়তা ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত বাঁচে। শিকারী, সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়াই এর প্রধান কারণ। নিশাচর প্রাণী হিসেবে এরা দিনের বেলা ঘন ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ও ঘুমায় কিংবা বিশ্রাম নেয়। কিন্তু গোধূলীলগ্নে এরা সক্রিয় হয়ে ওঠে ও শিকারের সন্ধানে বের হয়।
খেঁকশিয়াল পৃথিবীর সব মহাদেশেই পাওয়া যায়। ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছে এন্টার্কটিকা মহাদেশ। যুক্তরাজ্যে একসময় খুবই জনপ্রিয় ও সাধারণ খেলা হিসেবে খেঁকশিয়াল শিকার প্রচলিত ছিল। ঘোড়া ও কুকুর সহযোগে এ শিকার ক্রীড়াটি বর্তমানে নিষিদ্ধ।
আলোকচিত্রী রানা মাসুদ জানান, দিনের আলোয় বাংলা খেঁকশিয়ালের ছবি তোলা বড় কঠিন। বর্তমান সময়ে উপকারী এই প্রাণীটি মহাবিপন্ন প্রজাতির পর্যায়ে চলে এসেছে। একে রক্ষার জন্য সকলের প্রচেষ্টা দরকার।




