রাজশাহী
টানা বৃষ্টিতে বিপাকে শহুরে মানুষ, স্বস্তি ফিরেছে কৃষিতে

ছবি: আগামীর সময়
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার পর ঝিরঝির বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি বুধবার ভোরে রূপ নেয় ভারী বৃষ্টিতে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজশাহী নগরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি তলিয়ে যায় পানিতে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও সড়কে থইথই পানি। জলাবদ্ধ সড়কে আটকে পড়ে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা। পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের। বৃষ্টি থামার পর কোথাও দ্রুত পানি নামলেও সকালজুড়ে ব্যাহত হয় নগরের স্বাভাবিক চলাচল।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ভোর থেকে হওয়া ভারী বৃষ্টিতে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়ক, বর্ণালী মোড়, হেতেমখা ও লক্ষ্মীপুর, তেরখাদিয়া ডাবতলা, তেরখাদিয়া উত্তরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এদিন ৯৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ।
বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি কমে গেছে। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চালকদের ঝুঁকি নিয়ে পানি পার হতে হচ্ছে। অনেক পথচারীকে কাপড় ও জুতা ভিজিয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও পানিতে যানবাহন আটকে সাময়িক যানজটও সৃষ্টি হয়।
বর্ণালী মোড় এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বললেন, ‘রাজশাহীকে দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর শহর বলা হয়। কিন্তু একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে যায়। তখন চলাচল করাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। সময়মতো ড্রেন পরিষ্কার না করায় এই সমস্যা হচ্ছে।’
কলেজশিক্ষার্থী আনিকা তাবাসসুম বললেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই ক্লাসে যেতে সমস্যা হয়। রাস্তার পানি অনেক সময় ড্রেনের ময়লার সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। সিটি করপোরেশনকে এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।’
তেরখাদিয়া উত্তরাপাড়া এলাকার বাসিন্দা বদরুজ্জামান বললেন, ‘তেরখাদিয়া ডাবতলা মোড় থেকে ক্যান্টনমেন্ট গেটু পুরো রাস্তাতেই হাঁটু পানি। ড্রেনের সঙ্গে বৃষ্টির পানির মিশে যাওয়ায় পানিতে চরম দুর্গন্ধ। এই পানিতেই পথচারীরা হেঁটে আবার কেউ অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে পার হচ্ছেন। এতে বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।’
নগরবাসীর অভিযোগ, জলাবদ্ধতা রাজশাহীর নতুন সমস্যা নয়। ভারী বৃষ্টি হলেই নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমে যায়। অনেক জায়গায় ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে।
এদিকে কয়েক দিনের খরার পর এই বৃষ্টি স্বস্তি এনেছে রাজশাহীর কৃষিতে। বর্ষা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় আমন চাষিরা সেচ দিয়ে জমির পানির চাহিদা মেটাচ্ছিলেন। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছিল। এখন বিভিন্ন এলাকায় আমন ধানে ফুল এসেছে। এই সময়ে বৃষ্টি হওয়ায় ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, ধানে ফুল আসা ও দানা গঠনের সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া ফলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে বৃষ্টি হলে আমন ধানের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
পবা উপজেলার দামকুড়া এলাকার আগাম সবজি চাষি মোশাররফ হোসেন ২৫ বিঘা জমিতে বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় জমির আর্দ্রতা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। আজকের বৃষ্টিতে সবজির অনেক উপকার হবে, সেচের খরচও কমবে।’
কৃষকের জন্য স্বস্তির এই বৃষ্টিই নগরবাসীর জন্য আবারও সামনে এনেছে জলাবদ্ধতার পুরোনো সমস্যা। ৯৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, আরও ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি কতটা সামলাতে পারবে নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা।
নগরবাসীর দাবি, সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে নয়, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পানি নিষ্কাশনের পথগুলো কার্যকর করতে হবে। বৃষ্টি প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনা; কিন্তু সেই বৃষ্টি যেন নগরবাসীর দুর্ভোগের কারণ না হয়- এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।








