বরিশাল
ভূত চতুর্দশীতে আলোকিত মহাশ্মশান

ছবি: আগামীর সময়
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে বরিশালে প্রতি বছরের মতো এবারও ঐতিহ্যবাহী শ্মশান দীপাবলি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। মোমবাতি ও প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো মহাশ্মশান এলাকা।
আজ শনিবার সন্ধ্যা থেকে নগরীর কাউনিয়া এলাকার বরিশাল মহাশ্মশানে এ উৎসব শুরু হয়। যা গভীর রাত পর্যন্ত চলে।
বরিশাল নগরীর পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকায় প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত এ মহাশ্মশানের ইতিহাস নগরীর পত্তনেরও আগের।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ধনাঢ্য জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় নতুন বাজার এলাকায় প্রথমে মহাশ্মশানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে জায়গার সংকটের কারণে কাউনিয়ায় নতুন করে শ্মশান প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন এই মহাশ্মশানে রয়েছে ৭০ হাজারেরও বেশি মঠ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মহাশ্মশান হিসেবে পরিচিত।
১৯২৭ সাল থেকে এ মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে। কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে প্রতি বছর এ আয়োজন করা হয়। পূর্বপুরুষ ও প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ভারত, নেপালসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ এখানে সমবেত হন।
এদিন প্রিয়জনের সমাধিতে প্রদীপ, মোমবাতি ও ধূপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বজনরা। ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সমাধি। কেউ কেউ প্রয়াত ব্যক্তির জীবদ্দশায় পছন্দের খাবারও নিয়ে আসেন। ইলিশ মাছ, পায়েসসহ নানা ধরনের খাবার সমাধিতে নিবেদন করেন তারা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো মহাশ্মশান। প্রদীপ ও মোমবাতি প্রজ্বালনের পাশাপাশি স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনায় অনেককে নামকীর্তন করতেও দেখা যায়।
এ মহাশ্মশানের ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। এখানে সমাহিত রয়েছেন বাংলা সাহিত্যের কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এ ছাড়া রয়েছেন ব্রিটিশবিরোধী নেতা বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসু মাসিমাসহ বিভিন্ন সময়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বাঙালি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও লেখক অশ্বিনী কুমার দত্তের চিতাভস্মও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে তার চিতাভস্ম এনে এই মহাশ্মশানে স্থাপন করা হয়।
মহাশ্মশানে শায়িত ব্যক্তিদের স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর ভূত চতুর্দশীর তিথিতে প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এখানে ছুটে আসেন তারা। যেসব সন্তান, মা-বাবা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সমাধি এখানে রয়েছে, তাদের স্মরণে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন স্বজনরা।
শ্মশান দীপাবলি উৎসবে আসা জয়দেব সাহা বলেন, প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তারা এখানে আসেন। প্রিয়জন জীবিত অবস্থায় যেসব খাবার খেতে পছন্দ করতেন, সেসব খাবারও সমাধিতে নিয়ে আসেন স্বজনরা। এরপর সমাধিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।
উজ্জ্বল দাস বলেছেন, দীপাবলি উৎসবের আগে মৃত স্বজনদের সমাধি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রঙ করিয়েছেন। শ্মশান দীপাবলির দিন সমাধি মোমবাতি ও প্রদীপ দিয়ে সাজিয়েছেন। অনেক সমাধি রয়েছে, যেগুলোর স্বজনরা আসেন না। সেসব সমাধিতেও মোমবাতি প্রজ্বালন করেছেন তারা। পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রতি বছরই এখানে আসেন তিনি।
শ্মশান পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, প্রতি বছর দীপাবলি উপলক্ষে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে এ মহাশ্মশানে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় ও পুরনো স্মৃতি ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে পুরো আয়োজন পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত বলেছেন, শনিবার বিকাল থেকেই দর্শনার্থীদের সমাগম শুরু হয়েছে। তাদের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। এ ছাড়া এর আগে পুরো মহাশ্মশান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। শ্মশানে আগতদের যাতে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে না হয়, সে জন্য সর্বত্র আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শনিবার শ্মশান দীপাবলি ও রবিবার কালীমাতার পূজা উপলক্ষে আয়োজনে কোনো কমতি রাখা হয়নি।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার জানিয়েছেন, শ্মশান দীপাবলির নিরাপত্তায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি-৮-এর সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া সাদা পোশাকে পুলিশ, ডিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নজরদারি করছেন। মহাশ্মশানের নির্দিষ্ট স্থানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় ফুট প্যাট্রোল পরিচালনা করা হয়েছে।




