‘আমি আসলে কে?’

মাস্ক পরা ভুক্তভোগী ক্লাউডিয়া ও তার আইনজীবী— আগামীর সময়
একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর একটি—‘আমি কে?’ অধিকাংশ মানুষ জন্মের পর থেকেই এই প্রশ্নের উত্তর জানে। কিন্তু সেই উত্তর খুঁজতেই আজ আদালতে ক্লাউডিয়া চৌধুরী (১৮)।
শৈশব থেকে যাদের মা-বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন, হঠাৎ একদিন তিনি জানতে পারেন তারা তার জৈবিক মা-বাবা নন। একটি তথ্যই বদলে দেয় তার পরিচয়ের ভিত্তি, বদলে যায় সরকারি নথিতে থাকা তথ্য, আর পাল্টে যায় জীবনের গতিপথ।
এরপর নিজের শিকড়, নিজের প্রকৃত পরিচয় খুঁজতে আজ তিনি আদালতে। পরিচয়-সংকটের গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে তার একটাই প্রশ্ন—‘আমি আসলে কে?’
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছে ক্লাউডিয়ার আইনি লড়াই।
আজ বুধবার রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চিকিৎসক ডা. শিপ্রা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ক্লাউডিয়া। যাকে তিনি মা হিসেব জানতেন। মামলায় প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান, অবৈধভাবে পরিচয় পরিবর্তন, জোরপূর্বক হলফনামা করানো এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সহযোগী মো. নাজমুলকেও এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, শিশুকালে অজ্ঞাত স্থান থেকে ক্লাউডিয়াকে নিয়ে এসে নিজের সন্তান পরিচয়ে লালন-পালন করেন ডা. শিপ্রা চৌধুরী। জন্মনিবন্ধন, টিকা কার্ড, নাগরিকত্ব সনদ, স্কুলের নথি, এসএসসি রেজিস্ট্রেশনসহ সব সরকারি ও শিক্ষাগত কাগজপত্রে ডা. শিপ্রা চৌধুরীকে মা এবং তার স্বামী মৃত ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরীকে বাবা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে জোর করে তার জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তন করেন শিপ্রা চৌধুরী ও তার সহযোগী নাজমুল। সেখানে নতুন করে মা-বাবা হিসেবে যুক্ত করা হয় ‘মো. বাবুল’ ও ‘মোসা. টগরী বেগমের’ নাম।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই সময় জোরপূর্বক আদালতে নিয়ে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করানো হয় ক্লাউডিয়াকে। পরদিন জানানো হয়, তিনি ওই পরিবারের জৈবিক সন্তান নন। এরপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন ক্লাউডিয়া। শুধু আশ্রয় নয়, হারিয়ে যায় তার পরিচয়ের ভিত্তিও। পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও তাকে ফেরত দেওয়া হয়নি। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, কলেজে ভর্তি এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে জটিলতার মুখে পড়তে হয় তাকে। এমনকি এই সংকট তার শিক্ষাজীবনের একটি মূল্যবান বছরও নষ্ট করেছে।
ক্লাউডিয়া বললেন, ‘মা-বাবার নাম থেকে তাদের নাম সরিয়ে নিয়েছে। যাদের নাম দেওয়া হয়েছে তাদের আমি কখনও দেখি নাই, চিনিও না। তাহলে, ‘আমি আসলে কে?’।
মামলার পর বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হযরত আলী জানান, আদালত অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে ক্লাউডিয়ার গল্প শুধু একটি মামলার গল্প নয়; এটি একজন মানুষের নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামের গল্পও।’
আইনজীবীর ভাষায়, ‘একজন মানুষ যখন জানে না তার প্রকৃত মা-বাবা কে? তার পরিচয় কী? তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। ক্লাউডিয়া এখন পরিচয় সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।’
বর্তমানে মামলায় দুইজনকে আসামি করা হলেও তদন্তে অন্য কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী।
এ বিষয়ে জানতে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সহযোগী নাজমুলের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে ম্যাসেজ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন।





