কক্সবাজারে বর্জ্য থেকে হবে ১.২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

ছবি: আগামীর সময়
নীল সমুদ্রের দীর্ঘ বালিয়াড়িতে পর্যটকের কোলাহলে দিন-রাত ব্যস্ত দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। কিন্তু সুন্দর এ শহরের বুক ঘেঁষে বাঁকখালী নদীর তীরে রয়েছে আরেক বাস্তবতা—বর্জ্যের পাহাড়ে ঢাকা কস্তুরাঘাট। দুর্গন্ধ, দূষণ আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবর্জনায় এলাকাটি পরিণত হয়েছে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকিতে।
কস্তুরাঘাট এলাকায় বছরের পর বছর ধরে জমতে জমতে কোথাও কোথাও বর্জ্যের স্তূপ ৪০ থেকে ৬০ ফুট উঁচু হয়েছে। প্রায় ১ একর এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল ভাগাড়। তবে এই বর্জ্যের পাহাড়ই এখন হতে পারে বিদ্যুতের উৎস। কক্সবাজার পৌর এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) প্রস্তাবিত আধুনিক ইন্টিগ্রেটেড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইডব্লিউএম) প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় ১ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, প্রকল্পের আওতায় প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরি, ফিকাল স্লাজ থেকে জৈব সার উৎপাদন এবং পয়োবর্জ্য পরিশোধনের জন্য সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের বর্জ্যের বোঝাই পরিণত হতে পারে বিদ্যুৎ, সার ও অর্থনৈতিক সম্পদে।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম. ইব্রাহিম খলিল মামুন জানিয়েছেন, কক্সবাজার পৌর এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পর্যটন মৌসুমে পর্যটকের চাপ বাড়লে তা প্রায় ১৭০ টনে পৌঁছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ টন প্লাস্টিক বর্জ্য।
তার ভাষ্য, ‘খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও বিভিন্ন প্যাকেজিং সামগ্রী প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে যুক্ত হচ্ছে শহরের বর্জ্যে। উৎস পর্যায়ে এসব বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্লাস্টিক, জৈব বর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেগুলোর ঠাঁই হচ্ছে ডাম্পিং এলাকায়।’
ডিপিএইচইর সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর জানালেন, পরিস্থিতি বদলাতেই আইডব্লিউএম প্রকল্পে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও শক্তি উৎপাদনকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, শহরের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে প্রায় ১ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ প্রকল্পের নিজস্ব কাজে ব্যবহার করা যাবে। প্রযুক্তিগত ও আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বড় চ্যালেঞ্জ কস্তুরাঘাটের পুরোনো বর্জ্যের পাহাড়। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্যের পরিমাণ ২ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি। এসব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ, জীবাণু ও মাটি-পানিদূষণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বৃষ্টির পানি বর্জ্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দূষিত তরল আশপাশের মাটি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কস্তুরাঘাটে পৌর এলাকার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন বর্জ্য পুরোনো স্তূপের ওপর ফেলায় ভাগাড়টি ক্রমেই বড় হচ্ছে। বর্জ্যের একটি অংশ জোয়ার-ভাটার পানিতে মিশে সাগরেও যাচ্ছে।
ডিপিএইচইর কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নসরুল্লাহ জানিয়েছেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কক্সবাজারে এরই মধ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। উখিয়া ও রামুতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তার তথ্যমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক কার্যক্রমে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিদিন প্রায় ১৬০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ কিলোওয়াট নিট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে।
রামুর মিঠাছড়িতেও পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। ফলে কক্সবাজার শহরের প্লাস্টিক বর্জ্য উৎস পর্যায়েই আলাদা করে সংগ্রহ করা গেলে তার একাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্য অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরিতে কাজে লাগানো সম্ভব বলে দাবি তার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। কক্সবাজার পৌরসভার নিজস্ব মালিকানাধীন এসএম পাড়া এলাকায় প্রয়োজনীয় জায়গা রয়েছে। তবে প্রকল্পের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর।
জমি বরাদ্দের ব্যাপারে জানতে কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো: শামীম আল ইমরানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেছেন, ‘আইডব্লিউএম প্রকল্প কক্সবাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে নতুন ব্যবস্থার পাশাপাশি কস্তুরাঘাটে বছরের পর বছর জমে থাকা বর্জ্যের পাহাড় কীভাবে নিরাপদে অপসারণ বা প্রক্রিয়াজাত করা হবে, তারও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
তার মতে, কক্সবাজারে প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া বিপুল বর্জ্য যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, তাহলে এতদিনের পরিবেশগত বোঝাই হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুতের কাঁচামাল। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত প্রকল্প কত দ্রুত বাস্তবায়নের মুখ দেখে।





