মাছ নেই ব্রহ্মপুত্রে, পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

নিজের নৌকা মেরামত করছেন এক জেলে। ছবি: আগামীর সময়
একসময়ের উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদ এখন নাব্য সংকটে জর্জরিত। নদীর বুক জুড়ে জেগে উঠেছে চর। কমেছে পানির গভীরতা, একই সঙ্গে কমে গেছে মাছও। কুড়িগ্রামের নদীতীরের শতাধিক জেলে পড়েছেন দুর্ভোগে। সংসার চালাতে তাদের অনেকে পেশা ছেড়ে অন্য কাজে ঝুঁকছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়ায় নদীর স্বাভাবিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতে মাছের প্রজনন, বিচরণ ও খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় দেশীয় মাছের নিরাপদ আবাসস্থলও সংকুচিত হচ্ছে।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন পয়েন্টে গত কয়েক বছরে মাছের প্রাপ্তি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। একসময় বড় আকারের নানা দেশীয় মাছে জেলেদের জাল ভরে উঠলেও এখন সারা দিন জাল ফেলেও ছোট পুঁটি বা টেংরা পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে নদীপাড়ের মাছ ধরা পরিবারগুলোয় অভাব-অনটন লেগেই আছে।
জেলেরা জানিয়েছেন, নদীতে মাছ না থাকায় জাল-নৌকা মেরামত এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে ঋণ করে দিন পার করছেন। কেউ কেউ অন্যের কাছে হাত পাতছেন। আবার পেটের দায়ে রাজমিস্ত্রির জোগালি, দিনমজুরি ও রিকশা চালানোর মতো কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
সরেজমিন চিলমারীসহ ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন ঘাটে দেখা গেছে, অনেক নৌকা অলস পড়ে আছে। কেউ কেউ জাল বুনছেন বা মেরামত করছেন। তবে আগের মতো নদীতে নামার ব্যস্ততা নেই। নদীর বুকে জেগে ওঠা বিশাল বালুচরে মাছ ধরার ব্যস্ততার বদলে বিরাজ করছে নীরবতা।
জোড়গাছা জেলে পাড়ার অঞ্জলী জানিয়েছেন, আগের মতো নদীতে মাছ নেই। যে মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে সংসার চালানো কঠিন। এ কারণে অনেকেই পেশা বদলাচ্ছেন। তাদের এলাকার অনেক জেলে কাজের সন্ধানে ঢাকায় চলে গেছেন।
তিনি আরও জানিয়েছেন, ইলিশ ধরা নিষেধের সময়ে কার্ডধারী জেলেরা সরকারি সহায়তা হিসেবে কিছু পরিমাণ চাল পান। তবে সারা বছর সংসার চালানোর জন্য এই সহায়তা যথেষ্ট নয়।
জেলে সুশান্ত বললেন, ‘বাপ-দাদার আমল থ্যাকি আমাগো বংশের সবাই নদীত মাছ ধরিই সংসার চালাইছে। কিন্তু এ্যালা নদীত আর মাছ নাই বল্লিলেই চলে। সারাদিন জাল টানিও তেলের দাম ওঠে না। পোলাপান লিয়াই তো বিপদে আছি। পেটের দায়ে বাধ্য হয়া অন্য কামকাজ শুরু করছি।’
অন্য জেলে শোনীল জানিয়েছেন, আগে নদীতে জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ মেলে না। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেকেই মাছ ধরা ছেড়ে অন্য আয়ের পথ খুঁজছেন।
নদীকর্মী জাহানুর রহমান জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমে আগের মতো নিয়মিত ও পরিমিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কখনো অসময়ে আকস্মিক বন্যা হচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজননচক্র ব্যাহত হচ্ছে।
তার মতে, তাপমাত্রা বাড়ার কারণে নদীর পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রায়ও পরিবর্তন ঘটছে। এতে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ মারা যাচ্ছে। অনেক প্রজাতি ডিম ছাড়ার উপযোগী পরিবেশও হারাচ্ছে।
জাহানুর রহমান আরও জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে বালুচর জেগে ওঠা এবং বর্ষায় অতিরিক্ত ঢলের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও প্রতিবেশব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মাছের আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী গভীরতা হারাচ্ছে। ফলে মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর ও নিরাপদ স্থানও কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে ২০২৩ সালের জুন, জুলাই ও আগস্টে যথাক্রমে ৫২১, ২৪১ ও ৫৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ২০২৪ সালে একই তিন মাসে বৃষ্টিপাত ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ১৩১, ৩৯৩ ও ১৭৮ মিলিমিটার। ২০২৫ সালে জুনে ৩৭৪, জুলাইয়ে ২৯৬ এবং আগস্টে ২৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
চলতি ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুড়িগ্রামে মোট ৯৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে জুনে ৪৭৩, জুলাইয়ে ৩৭৮ এবং আগস্টে মাত্র ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা সৌমিক জানিয়েছেন, গত দু-তিন বছরে মৌসুমি বন্যার পরিবর্তে আকস্মিক ও স্বল্পস্থায়ী বন্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জেলার নদ-নদীর অববাহিকায় মৌসুমি বড় বন্যার জন্য টানা এক থেকে দুই সপ্তাহ ভারী বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন এসেছে। যখন যতটা বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, তখন ততটা হচ্ছে না। আবার অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। বাকি সময় থাকছে বৃষ্টিহীন।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মৎস্যজীবীরা ব্রহ্মপুত্রের গভীর ও উপযুক্ত স্থানগুলোয় স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখার পাশাপাশি অবৈধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ও পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
পেশা বদলাতে জেলেদের জন্য সরকারি ভিজিএফ সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি গবাদিপশু পালন, কুটির শিল্প ও অন্যান্য জীবিকায় প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজনন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে অবৈধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দের পাশাপাশি ধ্বংস করা হচ্ছে। জেলেদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরিতেও সরকারের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।




