সম্পাদকীয়
সাগরে জেলেদের কষ্টের ঢেউ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র শুধু নীল জলরাশি নয়, এটি সম্ভাবনাময় এক বিশাল অর্থনৈতিক ভাণ্ডার। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকায় মাছ ধরা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একচ্ছত্র অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। এই বিশাল জলসীমা দেশের ব্লু ইকোনমির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক খনিজ, পর্যটন, জাহাজ চলাচল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য— সব মিলিয়ে ব্লু ইকোনমি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সক্ষমতা রাখে। দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত সম্ভাবনার মধ্যেও উপকূলের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন শুধু হতাশার ঢেউ।
গতকাল মঙ্গলবার আগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘জাল ফেললেই লোকসান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে হতাশাজনক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। যে সমুদ্র একসময় জেলেদের জীবিকা নিশ্চিত করত, সেই সমুদ্রে দিনের পর দিন জাল ফেলেও অনেকে পর্যাপ্ত মাছ পাচ্ছেন না। ডিজেল, বরফ, খাদ্য ও শ্রম ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ; কিন্তু মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় খরচও উঠছে না। অনেক ট্রলার মালিক ঋণের বোঝা বইছেন, অনেক জেলে পরিবার-সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের কিছু অসাধু জেলে ও ট্রলার অবৈধভাবে মাছ আহরণ করছে, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বড় জাহাজ দিয়ে তারা গভীর সমুদ্রের মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ার ফলে দেশীয় জেলেরা মাছের স্বাভাবিক প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সমুদ্রে পানির তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে মাছের বিচরণক্ষেত্র বদলে যাচ্ছে। অনেক প্রজাতির মাছ গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের উপকূলীয় অর্থনীতিতে।
আবার সামনে মা ইলিশ সংরক্ষণ মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সাগরে নেমে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় তারা পড়েন গভীর সংকটে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, সেই জেলে সম্প্রদায়ই আজ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শুধু কক্সবাজারে এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মানুষের সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বৈরী আবহাওয়া, ঋণের বোঝা, মাছের সংকট— সবকিছুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেও তারা প্রাপ্য মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।
জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক তাপমাত্রাসহ নানা ধরনের দূষণ বাড়ছে। পাশাপাশি লবণাক্ততা ও সাগরে দূষণও বাড়ছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাছের প্রজননও কমে যাচ্ছে। সাগরে প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের দূষণে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। কিছু জালের ব্যবহার ডিম-পোনা ও মাছ নিধনে ভূমিকা রাখছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমুদ্রসীমায় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে, যাতে অবৈধ মাছ শিকার কঠোরভাবে দমন করা যায়। ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, মাছের প্রজনন সংরক্ষণ এবং টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বীমা সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করাও প্রয়োজন। পাশাপাশি মাছ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি খাতে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।



