ভরসার হাসপাতালে সেবাবঞ্চনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অকেজো পড়ে আছে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি; এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ জনবলের তীব্র সংকট। হতাশাজনক এ চিত্র প্রাথমিক ও মাঝারি চিকিৎসার একমাত্র ভরসা খুলনার নয় উপজেলার প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ফলে প্রতিদিন গ্রামের বিপুল দরিদ্র মানুষ কম খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় এসব হাসপাতালে এলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। উপায় না পেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা জেলা সদরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা; যার ব্যয় মেটাতে তাদের হিমশিম অবস্থা।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৭৭৭ পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৭৫৮টি পদ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদ শূন্য রয়েছে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এখানে ২৫০ পদের ১২৪টিই শূন্য। দাকোপ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১৪ পদের ৮৭টি, বটিয়াঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪২ পদের ৫৬টি, রূপসা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭২ পদের ৭৬টি, তেরখাদা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭৫ পদের ৮৪টি, দিঘলিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮৩ পদের ৭৩টি, ফুলতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬২ পদের ৪৯টি, ডুমুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭৮ পদের ১০৮টি এবং কয়রা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১ পদের ১০১টি শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাঁচ চিকিৎসক অন্যত্র প্রেষণে, দিঘলিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অননুমোদিত অনুপস্থিত একজন এবং ঢাকা ডিএনসিসি হাসপাতালে সংযুক্ত একজন, পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অননুমোদিত অনুপস্থিত একজন এবং তেরখাদা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অননুমোদিত অনুপস্থিত একজন চিকিৎসক। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ হাসপাতালেই আবাসিক মেডিকেল অফিসার, অ্যানেসথেশিয়া, সার্জারি, গাইনি, শিশু, চর্ম ও যৌন, চক্ষু রোগের চিকিৎসক নেই।
বিষয়টি নিয়ে হতাশ খোদ হাসপাতালের প্রধানরাই। প্রসঙ্গটি নিয়ে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ আগামীর সময়কে জানিয়েছে, তার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহিঃবিভাগে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এ ছাড়া হাসপাতালে ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিনই ১২০ থেকে ১৫০ রোগী ভর্তি থাকেন। অথচ এসব রোগীর সেবা দেওয়ার জন্য মেডিসিন, সার্জারিসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের মেডিকেল অফিসার পদে কোনো চিকিৎসক নেই। ফলে এসব রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে তীব্র জনবল সংকটের পাশাপাশি ৯ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে অসংখ্য যন্ত্রপাতি সংকট। এর মধ্যে বেশি সংকট রয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কমপ্লেক্সটিতে অকেজোর তালিকায় রয়েছে ১৬টি যন্ত্র। সেগুলো হলো— একটি এক্স-রে মেশিন, দুটি ইসিজি, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, দুটি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, দুটি মাইক্রোস্কোপ, একটি অটোক্লেভ, দুটি ডেন্টাল ইউনিট, একটি ডায়াথারমি মেশিন, দুটি জেনারেটর ও একটি অ্যাম্বুলেন্স।
দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অকেজো রয়েছে একটি মাইক্রোস্কোপ, একটি ইসিজি মেশিন ও একটি অ্যাম্বুলেন্স। তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি এক্স-রে মেশিন, তিনটি ইসিজি, একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, দুটি ডেন্টাল ইউনিট ও একটি জেনারেটর অকেজো রয়েছে।
অকেজো যন্ত্রপাতির তথ্য বলছে, ৯টি হাসপাতালেই ইসিজি, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও অ্যানেসথেশিয়া মেশিন অচল।
সম্প্রতি ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন রামকৃঞ্চপুর গ্রামের ফুলমতি রায় (৬৯)। তার ছেলে পঞ্চরাম জানালেন, হাসপাতালের ডাক্তার তার মায়ের ব্যবস্থাপত্রে আলট্রাসনোগ্রাম টেস্ট লিখে দেন। কিন্তু হাসপাতালে পরীক্ষাটি বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করতে হয়েছে। এতে তার অতিরিক্ত খরচ ও সময় অনেক বেশি লেগেছে। সেই সঙ্গে বৃদ্ধ মাকে হাসপাতাল থেকে দূরের ক্লিনিকে যাওয়া-আসায় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
কয়রা উপজেলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল করিম বলেছেন, হাসপাতালে বর্তমানে কোনো টেকনিশিয়ান নেই। ফলে আপাতত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া জরুরি রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সে ১০০ কিলোমিটার দূরে খুলনা শহরে নিতে হয়। কিন্তু হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সচালকও নেই।
বিষয়টি নিয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার আগামীর সময়কে বলেছেন, গ্রামের স্বল্পআয়ের হতদরিদ্র, দিনমজুর ও কৃষক শ্রেণির মানুষের পক্ষে দূর-দূরান্তের শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুলোতে চলছে নামমাত্র সেবা। অনেকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছে; যার খরচ তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলছে।
খুলনা সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা বেগম বলেছেন, জনবল নিয়োগের ব্যাপারে চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এরই মধ্যে অচল যন্ত্রপাতির তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।







