ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়াঙ্গন এখন অসহায় ‘ক্রীড়নক’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাব। ঐতিহ্যবাহী শুটিং ও ক্রীড়া ক্লাব হিসেবে একসময় ব্যাপক পরিচিতি ছিল দেশ জুড়ে। তবে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান অলিখিতভাবে নিজের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন আওয়ামী শাসনামলের পুরো সময়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্লাবটি এখন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। ক্লাবের অংশবিশেষ বর্তমানে পরিণত হয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশাস্ট্যান্ড ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের আখড়ায়।
যে কারণে আক্রান্ত হয় রাইফেল ক্লাব: ক্লাব-সংশ্লিষ্টরা জানালেন, আওয়ামী শাসনামলে রাইফেল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক করা হয় শামীম ওসমানের বন্ধু খালেদ হায়দার খান কাজলকে। তিনি নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিও ছিলেন। মূলত কাজলকে ব্যবহার করে গত ১৭ বছর ক্লাবের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখেন শামীম ওসমান। ক্লাবটি হয়ে ওঠে তার ব্যক্তিগত কার্যালয় ও ‘টর্চার সেল’। চব্বিশের ১৭ জুলাই এই ক্লাব থেকে বেরিয়ে দলবল নিয়ে শহরে সশস্ত্র মহড়া দেন শামীম। হাসিনার সরকার পতনের পর ক্ষোভ আছড়ে পড়ে ক্লাবটির ওপর। হামলা, ভাঙচুরের সঙ্গে দুই দফা করা হয় অগ্নিসংযোগ। লুট হয়ে যায় এখানে থাকা শুটিংয়ের অস্ত্রগুলো।
৮৩টি অস্ত্র, ১০ হাজার গুলি উদ্ধারে অগ্রগতি নেই: চব্বিশের ৪ ও ৫ আগস্ট রাইফেল ক্লাবের ৮৩টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসহ ১০ হাজার ৫৯৪টি গুলি লুট হয় বলে জানালেন ক্লাবটির শুটিং সম্পাদক কাজী ইমরুল কায়েস। ক্লাবের ভল্ট ভেঙে এসব লুট করা হয়। এ ঘটনায় ২০২৪ এর ৭ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতপরিচয় ২ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন কায়েস।
রাইফেল ক্লাবের লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অটোমেটিক ও আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে উল্লেখ করে কাজী ইমরুল কায়েস যোগ করলেন, ‘লুট হওয়া শুটিং অস্ত্রের মধ্যে ম্যানুয়াল ও অটোমেটিক অস্ত্র রয়েছে। অটোমেটিক অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পড়লে তা অবশ্যই বিপজ্জনক। এই পর্যন্ত চারবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে, অগ্রগতি বলতে কিছু নেই।’ মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আবু রায়হান জানান, কার্যক্রম চলমান আছে। তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বললেন, ‘রাইফেল ক্লাবের একটি অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারছি না আমরা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলাম। কিন্তু কোনো তথ্য পাইনি। এখনো রাইফেল ক্লাবের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
রাইফেল ক্লাবের বর্ণাঢ্য অতীত: ১৯৫০ সালে চাষাঢ়ায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এক বিঘা জমিতে রাইফেল ক্লাবটি গড়ে ওঠার পর ঐতিহ্যবাহী শুটিং ও ক্রীড়া ক্লাব হিসেবে দেশ জুড়ে পরিচিতি পায়। ১৯৯১ সালে শ্রীলঙ্কায় সাফ গেমসে এই ক্লাবের শুটার শাহানা পারভীন দেশের ইতিহাসে প্রথম স্বর্ণপদক লাভ করেন শুটিংয়ে। ক্লাবের ক্রিকেট টিমের অনেকেই যেমন জাহাঙ্গীর আলম, শাহরিয়ার হোসেন, জাকারিয়া ইমতিয়াজ, জুয়েল হোসেন ওরফে মনা জাতীয় দলে খেলেছেন। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী আরও ৩৩ শতাংশ জায়গা ৩০ বছরের জন্য নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের নামে ইজারা নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করে দেয়। রাইফেল ক্লাব বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের অন্তর্গত।
ক্লাবের শুটিং সম্পাদক কাজী ইমরুল কায়েসের ভাষ্য, ‘অনেকের ধারণা, এই ক্লাব শামীম ওসমানের ঘাঁটি। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। পুলিশ, সামরিক বাহিনী, বিজিবিতে কর্মরত ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এখানে। শামীম ওসমান উনার বন্ধু ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে এখানে ব্যক্তিগত কার্যক্রম চালিয়েছেন। পালিয়ে যাওয়া শামীমের স্বেচ্ছাচারিতার মাশুল দিতে হয়েছে ক্লাবকে। অথচ এই ক্লাব অতীতে ১১ বছর চ্যাম্পিয়ন ছিল।’
ক্লাব সরাতে লাগবে আরও এক বছর: রাইফেল ক্লাব সরিয়ে অসম্পূর্ণ ছয় লেন সড়কের কাজ শেষ করা হলে শহরের যানজট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মত নগর বিশ্লেষকদের।
পদাধিকার বলে নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। আগামীর সময়কে তিনি জানালেন, রাইফেল ক্লাব সরিয়ে রাস্তা প্রশস্তকরণ করতে সেনাবাহিনী এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) সঙ্গে আলোচনা চলমান আছে। আলোচনা সাপেক্ষে তারা উভয়ে জমিটি এক্সচেঞ্জ করবে, সেটা হলেই রাইফেল ক্লাব সরিয়ে নেওয়া যাবে। তা ছাড়া লুট হওয়া অস্ত্রের উদ্ধারকাজ করে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের উপব্যবস্থাপক ও নারায়ণগঞ্জ সড়ক উপ-বিভাগ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৗশলী আহসান উল্লাহ মজুমদার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবের জায়গাটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। যে কারণে আমরা বিগত দিনে চাষাঢ়া মোড় ছয় লেনে উন্নীতকরণ করতে পারিনি। কিন্তু বর্তমানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তি হয়েছে, তারা রাইফেল ক্লাবের জায়গা আমাদের দিয়ে দেবে, এর বিনিময়ে কিছু কিছু স্থানে সড়কের পাশে আমাদের খালি জায়গা রয়েছে, সেগুলো তারা নেবে। আশা করছি, চুক্তি শেষ হলেই আগামী এক বছরের মধ্যেই রাইফেল ক্লাব সরিয়ে নেওয়া হবে।’
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে জানিয়েছি। আমি সংসদেও বিষয়টি তুলেছি। এর দ্রুত সুরাহা হবে।’




