অকেজো আবহাওয়া অফিস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রঝড় কিংবা অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগপ্রবণ জেলার তালিকায় কক্সবাজারের অবস্থান প্রথম সারিতে। অথচ এমন একটি জেলার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের রাডার তিন বছর ধরে অচল। এ কারণে স্থানীয়ভাবে আবহাওয়ার তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা হারিয়ে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসকে এখন নির্ভর করতে হচ্ছে ঢাকার রাডার, স্যাটেলাইট এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্যসূত্রের ওপর।
কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউজসংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘ডপলার রাডার স্টেশনটিতে’ গিয়ে দেখা যায়, স্থাপনাটি এখন প্রায় নিশ্চুপ। ভবনটি ঠিকঠাক থাকলেও বন্ধ রয়েছে রাডারের প্রযুক্তিগত কার্যক্রম। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। অনুমোদিত জনবলের বড় অংশও দীর্ঘদিন ধরে নেই।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার রাডার স্টেশনটি ২০০৭ সালের ২২ এপ্রিল জাপান সরকারের অর্থায়নে জাইকার সহায়তায় আধুনিক ডপলার প্রযুক্তিতে উন্নীত করা হয়। প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সক্ষম এই রাডার কয়েক মিনিট পরপর ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও মেঘের গতিপ্রকৃতির তথ্য সংগ্রহ করে ভি-স্যাট (VSAT) প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাত। কিন্তু যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট থেকে এটি সম্পূর্ণ অচল।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলছিলেন, ‘রাডার বন্ধ থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে রাডার সচল থাকলে সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকার আরও দ্রুত এবং নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হতো।’
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক গোলাম মুর্তজা হোসেনের ভাষ্য, ‘প্রতিটি ফ্লাইট পরিচালনায় আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রাডার সচল থাকলে আরও দ্রুত এবং নির্ভুল তথ্য পাওয়া যেত।’
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেছেন, ‘কক্সবাজারের মতো দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলায় কার্যকর রাডার না থাকা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে সমুদ্রগামী জেলে, বিমান চলাচল, পর্যটন ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।’ কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন কথায়, ‘সমুদ্রে মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক থাকে না। হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হলে জেলেদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। দ্রুত ও নির্ভুল পূর্বাভাস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ঢাকা, কক্সবাজার, রংপুর, মৌলভীবাজার ও পটুয়াখালীতে পাঁচটি ডপলার রাডার রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে অচল। সম্প্রতি রংপুরের রাডারও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ। ফলে দেশের রাডার নেটওয়ার্কের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন বলেছেন, ‘কক্সবাজারসহ দেশের কয়েকটি স্থানে নতুন প্রজন্মের ডপলার রাডার স্থাপনের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও শেষ হয়েছে।’
গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশের ভাষ্য, শুধু নতুন রাডার স্থাপন করলেই হবে না। নিয়মিত এর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতেও একই সংকট ফিরে আসবে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বললেন, ‘উপকূল জুড়ে যখন ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমের টান টান উত্তেজনা, তখন কক্সবাজারে দাঁড়িয়ে আছে একটি অচল রাডার।’
‘কক্সবাজারের অচল ডপলার রাডার দ্রুত সচল করা হোক’— এই দাবি করেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী




