কক্সবাজারে সংঘটিত অপরাধের মূলে মাদক: সাচিং প্রু

কথা বলছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী
কক্সবাজারে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের পেছনে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী।
তিনি বলেছেন, মাদক এখন শুধু কক্সবাজারের সমস্যা নয়, এটি সারা দেশের একটি বড় সমস্যা। মাদকের বিস্তার রোধে সরকার কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ নিয়ে বিশেষ সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী বলেছেন, ‘কক্সবাজারে যত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তার সবকিছুর মূলে রয়েছে মাদক। মাদক শুধু কক্সবাজারের নয়, সারা দেশের একটি ইস্যু। কক্সবাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গেও মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মাদক নির্মূলে সরকার কাজ করছে।’
তিনি বলেন, মাদক আমাদের আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, উখিয়া, টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং বান্দরবানের লামা, আলীকদম ও থানচি সীমান্ত দিয়ে যাতে মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সীমান্তের মাদক পাচারের রুটগুলো বন্ধ করতে হবে।
জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় কক্সবাজারের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পর্যটন, মৎস্য, চিংড়ি, শুঁটকি, লবণ, মিষ্টি পান ও সুপারিসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাত নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল যোগাযোগ, টেকনাফ-সেন্টমার্টিন পর্যটন এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কসহ জেলার চলমান ও সম্ভাব্য উন্নয়ন কার্যক্রমও সভায় তুলে ধরা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও কক্সবাজারের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক পাচার, সাগরপথে মানবপাচার, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ সময় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির প্রভাব বৃদ্ধি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং টেকনাফ স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়েও আলোচনা হয়। সীমান্তের চোরাইপথে সার, সিমেন্টসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
মাদক কারবারিদের শুধু বহনকারী হিসেবে নয়, মূলহোতা ও গডফাদারদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।
তিনি বলেছেন, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে কেউ অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়ে থাকলে তার সম্পদের উৎস তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
সার সংকট ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। এমপি লুৎফুর রহমান কাজল ইউনিয়নভিত্তিক নয়, কৃষকের সংখ্যার ভিত্তিতে সার বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেন। কৃষি কর্মকর্তার পক্ষ থেকে জানানো হয়, জেলার ১০ উপজেলায় প্রায় ২৩ হাজার কৃষক কার্ডের আওতায় সার বরাদ্দের ব্যবস্থা রয়েছে।
সার পাচার রোধে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। তবে বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপব্যবহার যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ দেন এমপি কাজল। ডেঙ্গু প্রতিরোধে হাসপাতাল, বাসাবাড়ি, রান্নাঘর, ওয়াশরুমসহ আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না জানান, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে খুব শিগগিরই ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
সভায় কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। মাদক মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি মাদকবিরোধী অভিযান জো রদারের পাশাপাশি কারবারের সঙ্গে জড়িত মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে মহল্লায় মহল্লায় মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী দপ্তরগুলোর জনবল ও যানবাহন সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, কক্সবাজারের দায়িত্ব পেলেও জেলার সার্বিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে। কক্সবাজারকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।





