বিরোধীদলীয় নেতা
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন-ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন

ছবি: আগামীর সময়
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে চীন, ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়াই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে একা বাংলাদেশের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগরীর উদ্যোগে এ মতবিনিময়সভার আয়োজন করা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এটি শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
তিনি নিজেও একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে তাদের জীবনযাপন ও দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখেছেন বলে জানান।
তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সাময়িক অর্থসহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। তাদের নিজ দেশে ফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কার সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা হবে, সেটিও একটি জটিল বিষয়।
এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের পাশাপাশি এ দুই দেশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর উদ্যোগ নিলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন শিবিরে অবস্থানের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন। সেখানে নতুন প্রজন্মও জন্ম নিচ্ছে, কিন্তু তাদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত।
রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও কর্মদক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের উৎপাদনমুখী কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে সীমিত পরিসরে জীবিকা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে শিবিরে অবস্থান করেও তারা কিছুটা স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
তিনি আরও বলেছেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন অশিক্ষা ও অবহেলার মধ্যে বেড়ে ওঠা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। তাই এ সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ডা. শফিকুর রহমান জানান, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সামর্থ্য অনুযায়ী এ সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকবে।
শাহজালাল মাজারের আয় নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রস্তাব সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান ও আয় ব্যবহারের বিষয়ে সরকার, মাজারের খাদেম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, মাজারের আয় কীভাবে সমাজ ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে সবার গ্রহণযোগ্য একটি টেকসই সমাধান হওয়া প্রয়োজন। কোনো পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নয়, আলোচনার মাধ্যমেই এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো উচিত।
মাজারের দানের টাকা ব্যবহারের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, কয়েক শ বছর ধরে এ বিষয়ে একটি প্রচলিত ব্যবস্থা চলে আসছে। বর্তমানে ৩৫ শতাংশ জেলা প্রশাসনের হিসাব এবং ৬৫ শতাংশ মাজার কর্তৃপক্ষের মধ্যে বণ্টনের যে ব্যবস্থা রয়েছে, সেটি নিয়েও আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেছেন, বিষয়টি ধর্মীয় হওয়ায় মাজারের আয় সমাজ ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা গেলে সেটি একটি ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাজারের খেদমতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা একটি পক্ষ, সরকার একটি পক্ষ এবং সিলেটের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ হতে পারে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংলাপের মাধ্যমে সুন্দর একটি সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। তবে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সমাধানটি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তিনি এমন একটি টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন, যা সংশ্লিষ্ট সবাই গ্রহণ করবেন এবং সমাজের কল্যাণে কাজে লাগবে।
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেছেন, তার কারণে সিলেটের এই মাটি গর্বিত। মাজার থেকে পাওয়া অর্থ সমাজ ও দ্বীনের কল্যাণে ব্যবহার করা হলে সেটি আরও বেশি মানুষের উপকারে আসতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তিনি কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানের অর্থ ব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরেন। তার মতে, মাজারের আয় সমাজকল্যাণে ব্যবহারের একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা করা গেলে মানুষের আস্থাও বাড়বে এবং দানের পরিমাণও বাড়তে পারে।
মতবিনিময়কালে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিকরা ভালো থাকলে গণমাধ্যম আরও কার্যকরভাবে মানুষের কথা তুলে ধরতে পারবে।
তিনি সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যনিষ্ঠতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষ নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। তবে বিরোধী দলের যৌক্তিক বক্তব্য ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকরা সিলেটসহ দেশের গণমাধ্যমের বিভিন্ন সমস্যা ও পেশাগত নানা বিষয় তুলে ধরেন। ডা. শফিকুর রহমান এসব বিষয় লিখিতভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংসদে ও সংসদের বাইরে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার আশ্বাস দেন।
সভায় সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূরসহ জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।





