২৫১ বেওয়ারিশ লাশ দাফন আজহারের

সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে কবর খুঁড়ছেন আজহার উদ্দিন- আগামীর সময়
সমাজে যখন অনেকেই নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ, তখন কিছু মানুষ নীরবে স্থাপন করেন মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ মো. আজহার উদ্দিন তেমনই একজন, যিনি নিজের অর্থ, সময় ও শ্রম দিয়ে হয়ে উঠেছেন বেওয়ারিশ মানুষের শেষ ঠিকানা।
২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় চারদিকে যখন আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর মিছিল; তখন আজহার উদ্দিনের মনে আসে এক মানবিক চিন্তা— যে মানুষগুলো মৃত্যুর পরও পরিচয়হীন, যাদের স্বজনের খোঁজ মেলে না, যাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই, তাদের জন্য কিছু করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই গড়ে তোলেন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ নামে একটি সংগঠন।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ১২ তরুণ বন্ধুকে নিয়ে সংগঠনটি চালু করেন আজহার। গত পাঁচ বছরে তারা দাফন করেছেন ২৫১টি বেওয়ারিশ লাশ।
শহরের পূর্ব মেড্ডা এলাকায় তিতাস নদীর পাড়ে খাসজমিতে তারা গড়ে তুলেছেন একটি কবরস্থান; যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত তারা, কেউ জানে না যাদের নাম-পরিচয়। কিন্তু ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর সদস্যদের কাছে তারা সবাই সমান সম্মানের। লাশ পাওয়ামাত্রই শুরু হয় তাদের কাজ। হাসপাতাল বা পুলিশের ফোন পেয়ে ছুটে যান সদস্যরা। গোসল করানো, কাফন পরানো, জানাজা— সবই সম্পন্ন হয় ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী। তারপর শেষ ঠিকানা সেই কবরস্থান।
এ ছাড়া অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, রক্তদান, অক্সিজেন সেবা, ওষুধ সরবরাহও করে সংগঠনটি।
‘মানুষ হিসেবে এটুকু দায়িত্ব আমার ছিল। আমি চাই, কোনো মানুষ যেন অবহেলায় পড়ে না থাকে— জীবিত কিংবা মৃত। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা কাজটি করে যাচ্ছি। হাসপাতাল বা পুলিশের কাছ থেকে খবর পেলেই আমরা দাফনের উদ্যোগ নিই। প্রতিটি মরদেহ আইনিপ্রক্রিয়া শেষে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, এরপর আমরা ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করি’— বললেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আজহার উদ্দিন।
সংগঠনের কার্যক্রম মূলত প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থায়নে পরিচালিত হয়। দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় কাফনের কাপড়, বাঁশ, চাটাই থেকে শুরু করে সব খরচ বহন করেন তিনি।
যে জায়গায় দাফন করা হয়, সেটি নিচু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তলিয়ে যায় পানিতে। আজহারের আক্ষেপ, ‘সামান্য মাটি ভরাট করলেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কয়েকবার জেলা প্রশাসন ও পৌরসভায় আবেদন করেছি; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
ট্রেন ও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া কিংবা অর্ধগলিত মরদেহ— এ ধরনের লাশই বেওয়ারিশ হিসেবে শনাক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় মিললেও স্বজনরা না আসায় সেসব মরদেহও দাফনের দায়িত্ব নেয় এই সংগঠন। ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ শুধু একটি সংগঠন নয়; বরং হয়ে উঠেছে স্বজনহীন মানুষের শেষ আশ্রয়, শেষ সম্মান।




