জামালপুর
৫৪০ স্কুলে নেই প্রধান শিক্ষক: চাপে ভারপ্রাপ্তরা, ব্যাহত পাঠদান

ছবি: আগামীর সময়
জামালপুরের ৫৪০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। জেলার ১ হাজার ১৬৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেই শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদ। ফলে সহকারী শিক্ষকদের কাউকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি সামলাতে হচ্ছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ। এতে শিক্ষকরা পড়ছেন বাড়তি চাপের মুখে, আর ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান ও বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত ১ হাজার ১৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৬২৪ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৫৪০টি পদ। শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, সহকারী শিক্ষকের ৬ হাজার ৩১৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতেও ৩৪৮টি পদ শূন্য। ফলে শিক্ষক সংকটের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ যুক্ত হয়ে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা দুই দিকেই তৈরি হয়েছে চাপ।
প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। কোথাও আবার সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি পাঠদান, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিখন কার্যক্রমের তদারকি, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, হিসাব-নিকাশ, দাপ্তরিক কাজ, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
জামালপুর পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় ২০১৩ সালে। জাতীয়করণের পর প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টিতে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক ও ৯৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সূরাফীয়া আক্তার বলেন, ‘২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। নিয়মিত পাঠদান করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সব প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজও আমাকে সামলাতে হয়। ফলে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। আমরা চাই, একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।’
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবরার আহাম্মেদ বলে, ‘আমাদের স্কুলে অনেক দিন ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। তাই একজন ম্যাডামকে প্রধান শিক্ষকের কাজও করতে হয়। তিনি অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে আমাদের সব সময় ক্লাস নিতে পারেন না। তখন অনেক সময় পড়াশোনারও ক্ষতি হয়। কিছুদিন আগে ক্লাস করার সময় আমার মাথার ওপর ছাদের প্লাস্টার খসে পড়েছিল। তখন আমি ব্যথা পেয়েছিলাম। এরপর থেকে স্কুলে এসে ক্লাস করতে একটু ভয় লাগে। আমরা চাই, আমাদের স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক আসুক আর স্কুলের ভবনটাও যেন দ্রুত মেরামত করা হয়।’
পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাশেদ মোশারফ বলেন, ‘প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক একজন অভিভাবকের মতো নেতৃত্ব দেন। তিনি বিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয় এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব কাজে নানা সংকট তৈরি হয়েছে।
শুধু প্রধান শিক্ষকের সংকটই নয়, বিদ্যালয়ে কোনো দপ্তরি বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীও নেই। ফলে দাপ্তরিক কাজের একটি বড় অংশ শিক্ষকদেরই সামলাতে হয়। এমনকি বিদ্যালয়ের বাথরুম ও শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আমরা নিজেরাই প্রতি মাসে ৩০০ টাকা করে চাঁদা দিই। এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ভবনটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ছাদের প্লাস্টার ও বিমের ঢালাই খসে পড়ছে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এসব সমস্যার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহ দেখান না।’
পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো জামালপুর সদর উপজেলার খুপীবাড়ী, চালাপাড়া ও তীর্থ সত্যপীর, বকশীগঞ্জ উপজেলার জিনিয়া উমর এবং মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতেও এর প্রভাব পড়ছে।
খুপীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানও চালিয়ে যেতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও পড়ে। আমরা চেষ্টা করলেও তারা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদগুলো পূরণ করা প্রয়োজন।’
বকশীগঞ্জ উপজেলার জিনিয়া উমর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শিউলি জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রায় সব দায়িত্বই শিক্ষকদের ওপর এসে পড়েছে। অফিসের নথিপত্র সংরক্ষণ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, হিসাব-নিকাশ ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে অফিসের কাজ, অন্যদিকে নিয়মিত শ্রেণি পাঠদান, দুই দায়িত্বের সমন্বয় করতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।’
জামালপুরের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদের বিষয়টি শুধু এই জেলার সমস্যা না। এটা সম্ভবত সারা বাংলাদেশেই রয়েছে। কারণ সর্বশেষ বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর কিছু শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন। যে কারণে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছিল না। শুনেছি, ওই মামলাগুলোর সমাধান হচ্ছে। এতে আইনি জটিলতাও কেটে যাবে। ফলে শূন্যপদে প্রধান শিক্ষক খুব দ্রুত নিয়োগ দেওয়া যাবে।’






