সপ্তাহে ৩ খুন কক্সবাজারে, বাড়ছে উদ্বেগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পর্যটন, সীমান্ত, পাহাড়-সমুদ্র এবং বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বরাবরই জটিল। কিন্তু চলতি বছরের অপরাধের পরিসংখ্যান সেই জটিলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বছরের প্রথম আট মাসেই জেলায় ঘটেছে ৯৪টি হত্যাকাণ্ড। অর্থাৎ গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিনজন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন।
বছরের শেষ চার মাস এখনও বাকি। এই পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের সংখ্যা বাড়ার চিত্রই দিচ্ছে না, বরং জেলার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও তৈরি করছে গভীর প্রশ্ন।
একই সময়ে সিঁধেল চুরি ও অন্যান্য চুরির ১২৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। শুধু আগস্ট মাসেই কক্সবাজারে ছয়টি খুন, ১৫টি চুরি, ১০টি ধর্ষণ, দুটি ডাকাতি ও দুটি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজারে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ৪ হাজার ৮৯৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৭১টি। অর্থাৎ বছরের আট মাসেই আগের পুরো বছরের মোট অপরাধের প্রায় ৬১ শতাংশ নথিভুক্ত হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। ২০২৫ সালে পুরো বছরে জেলায় ১৩৮টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আট মাসেই ঘটেছে ৯৪টি। গত বছরের পুরো বছরের তুলনায় সংখ্যা কম হলেও এরইমধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ পূরণ হয়ে গেছে। সামনে আরও চার মাস থাকায় বছর শেষে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা নিয়েই উদ্বেগ।
পুলিশের ভাষ্য, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামাজিক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
চুরির পরিসংখ্যানও কম উদ্বেগের নয়। ২০২৫ সালে জেলায় ৭৫টি সিঁধেল চুরি ও ৭৩টি অন্যান্য চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সিঁধেল চুরি ৫৮টি এবং অন্যান্য চুরি ৬৫টি। সব মিলিয়ে আট মাসে ১২৩টি চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এর বাইরে গাড়ি, গবাদিপশু ও বসতঘরে চুরির ঘটনাও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ঘটনা থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। পর্যটন মৌসুমে বিপুল মানুষের সমাগমে চুরি, ছিনতাই ও প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ে।
টেকনাফ ও উখিয়া দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক চোরাচালানের রুট হিসেবে পরিচিত। এর সঙ্গে অস্ত্র, জালনোট, প্রতারণা, জালিয়াতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও যুক্ত হয়েছে। নতুন করে সাইবার ও ডিজিটাল অপরাধ পুলিশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি জায়গা আদালত প্রাঙ্গণ। বিচারককে ভয় দেখাতে পিস্তল প্রদর্শনের অভিযোগ থেকে শুরু করে আদালত এলাকায় প্রকাশ্যে গুলির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মান্নান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এদিকে খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করায় স্থানীয় সাংবাদিক অন্তর দে বিশালকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ মুছে না ফেললে তাকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানানো হলেও উল্টো তাকে নিউজ করা নিয়ে নানা প্রশ্ন করা হয়। পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়।
পুলিশের ভেতরেও অসন্তোষের চিত্র পাওয়া গেছে। সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে জেলা পুলিশের ১০১ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতজন পরিদর্শক, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই ও ৩৪ জন কনস্টেবল রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, চট্টগ্রাম বিভাগের স্থায়ী বাসিন্দা কর্মকর্তাদের বদলি করে অন্য জেলা থেকে পছন্দের কর্মকর্তাদের এনে কক্সবাজারে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করা হচ্ছে। এর পেছনে পুলিশ সুপারের অবৈধ কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের উৎস চিহ্নিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, মাদক ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর করা জরুরি।
তবে পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের দাবি, সারা দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। কক্সবাজারে মাসে ১৫ থেকে ২০টি হত্যাকাণ্ড হয়। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড সামাজিক বিরোধ, পরকীয়া ও পারিবারিক কারণে ঘটে। এসব ঘটনায় জড়িতদের অধিকাংশকেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘অপরাধের সঙ্গে কোনো আপস নয়। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ অপরাধের লাগাম টেনে ধরবেই।’





