টেকনাফে ‘সলিমপুর মডেলে’ যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত

কক্সবাজারের বাহারছড়া এলাকায় অপহরণ, মুক্তিপণ, মাদক ও মানবপাচার দমনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর পাহাড়ে পরিচালিত অভিযানের আদলে বিশেষ সমন্বিত যৌথ অভিযান চালানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে অপহরণপ্রবণ (হটস্পট) এলাকায় স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপন, পাহাড়ে চিরুনি অভিযান জোরদার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব উঠে এসেছে।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে চার ঘণ্টাব্যাপী টেকনাফ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রথমবারের মতো জেলার ও উপজেলার সব প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একসঙ্গে অংশ নেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী।
সভায় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম. সাজেদুর রহমান, রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ, র্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিয়ানুল হালিম খান, ১৫ এপিবিএনের অধিনায়ক মুস্তাফিজুর রহমান, কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোমেল মণ্ডল, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারসহ বিজিবি, র্যাব, কোস্ট গার্ড, বনবিভাগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা।
সভায় অংশ নেওয়া এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বাহারছড়া ইউনিয়নে অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতি সভায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে একসময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর পাহাড়ের তুলনা করেন।
তাদের মতে, বাহারছড়াকে অপহরণকারী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও মানবপাচারকারী চক্রের দখলমুক্ত করতে সলিমপুর মডেলে দ্রুত সমন্বিত যৌথ অভিযান প্রয়োজন। এ ছাড়া অপহরণপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপন এবং নিয়মিত টহল বাড়ানোর বিষয়েও সভায় ঐকমত্য হয়।
সভা শেষে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে সংঘটিত অপহরণ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধ দমনে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যেই এ বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বললেন, শিগগিরই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে। রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং বাহারছড়াসহ অপহরণপ্রবণ এলাকাগুলোয় অপরাধ দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ সভায় রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে কোনো ধরনের যানবাহন বা বাড়ির মালিক হতে না পারে এবং বিকাশসহ মোবাইল আর্থিক সেবার সিম ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তার দাবি, অপহরণের মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অবৈধ আর্থিক লেনদেনে এসব সিম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া টেকনাফের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আবার যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেছেন, এতে অবৈধভাবে এনআইডি পাওয়া রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেছেন, বাহারছড়াবাসীকে দীর্ঘদিনের অপহরণ আতঙ্ক থেকে মুক্ত করতে বিশেষ যৌথবাহিনী গঠন এবং অপহরণপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপন জরুরি।
তিনি অপহরণকারী, মানবপাচারকারী ও সশস্ত্র অপরাধী চক্রের সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানান।
সভায় টেকনাফের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পাহাড়ে নিয়মিত চিরুনি অভিযান পরিচালনা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার, মানবপাচার ও মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং অনলাইন জুয়া বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভার আয়োজকরা জানিয়েছেন, টেকনাফবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সীমান্তবর্তী এ জনপদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করবে।




