দুর্গম পথের শেষে দামতুয়ার মায়াবী ঝরনা

ট্রেক শেষে যখন চোখের সামনে ঝরনার জলধারা ধরা দেয়, তখন দুর্গম পথের ক্লান্তি অনেকটাই ভুলে যেতে হয়। ছবি: আগামীর সময়
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, দুর্গম পথ, ঘন সবুজ বন আর নীরব পাহাড়ি পরিবেশ— সব মিলিয়ে বান্দরবানের আলীকদমের দামতুয়া ঝরনা যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক ছবি। স্থানীয়দের কাছে এটি ডামতুয়া, তুক অ কিংবা লামোনই ঝরনা নামেও পরিচিত। পর্যটকদের কাছে দুর্গম হলেও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে দামতুয়ার আকর্ষণ আলাদা।
দামতুয়া ঝরনার অবস্থান ব্যাঙ ঝিরিতে। স্থানীয় মুরং ভাষায় ব্যাঙকে বলা হয় ‘তুক’ আর ঝিরিকে ‘অ’। এ থেকেই ‘তুক অ’ নামটির উৎপত্তি। জলপ্রপাতের খাড়া দেয়াল বেয়ে ব্যাঙ বা মাছ ওপরে উঠতে পারে না— এমন বৈশিষ্ট্য থেকেই স্থানীয়ভাবে ‘দামতুয়া’ নামটির প্রচলন। আবার দুই দিক থেকে পানি পড়া এবং ঝরনার আশপাশে চাঁদের আলোয় তৈরি হওয়া অনন্য দৃশ্যের কারণে স্থানীয়রা একে ‘লামোনই’ও বলেন। ‘লামো’ অর্থ চাঁদ, আর ‘নই’ অর্থ আলো।
বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ঝরনাটির সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে। তখন পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে পানির প্রবল ধারা। তবে অতিবৃষ্টির সময় পথ পিচ্ছিল ও দুর্গম হয়ে ওঠে। তাই আবহাওয়া বিবেচনা করে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা জরুরি।
দামতুয়া যেতে হলে প্রথমে আলীকদমে পৌঁছাতে হবে। সেখানকার পানবাজার থেকে বাইক বা জিপ নিয়ে আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার পয়েন্টের আদুপাড়ায় যেতে হয়। পথে নির্ধারিত নিরাপত্তা চৌকিতে পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। আদুপাড়া থেকে শুরু হয় মূল ট্রেকিং। যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টার এই পথ পাহাড়, ঝিরি ও দুর্গম সবুজ অরণ্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে।
দামতুয়া দেখতে গাইড নিতে হয়। আদুপাড়ায় স্থানীয় গাইড পাওয়া যায়। দামতুয়ার পাশাপাশি আশপাশের আরও কিছু প্রাকৃতিক স্থান, যেমন ওয়াং-পা ঝরনাও ঘুরে দেখা যায়।
তবে দামতুয়া ভ্রমণ সবার জন্য সহজ নয়। দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটার সক্ষমতা, পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং ভালো গ্রিপের জুতা সঙ্গে রাখা জরুরি। বর্ষায় জোঁকের উপদ্রবও থাকতে পারে। পাহাড়ি পথ ও ঝিরিতে চলার সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।
দামতুয়ার সৌন্দর্য শুধু ঝরনার পানিতে নয়; সেখানে পৌঁছানোর পথটিও যেন ভ্রমণের বড় অংশ। পাহাড়ের নীরবতা, ঝিরির শব্দ আর সবুজের গভীরতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ট্রেক শেষে যখন চোখের সামনে ঝরনার জলধারা ধরা দেয়, তখন দুর্গম পথের ক্লান্তি অনেকটাই ভুলে যেতে হয়। প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে চান—এমন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দামতুয়া হতে পারে অন্যরকম এক পাহাড়ি অভিজ্ঞতা।




