পাহাড়ের নীরবতায় থানকোয়াইন ঝরনা

পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে থানকোয়াইন ঝরনার স্বচ্ছ জল। ছবি: আগামীর সময়
পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে স্বচ্ছ জলের ধারা। চারপাশে সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর কোথাও কোথাও ছুটে চলা পাহাড়ি ছড়া। জনবসতির কোলাহল নেই। আছে শুধু ঝরনার পানির ছলছল শব্দ আর পাহাড়ি প্রকৃতির গভীর নীরবতা। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার থানকোয়াইন ঝরনায় গেলে এমনই এক প্রকৃতির দেখা মেলে।
প্রকৃতির খুব কাছাকাছি গিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে চান যারা, তাদের জন্য থানকোয়াইন হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য। তবে এখানে পৌঁছাতে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হবে না, সঙ্গে চাই কিছুটা প্রস্তুতি আর দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটার মানসিকতা।
আলীকদম বাজার থেকে থানকোয়াইন ঝরনার দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। থানকোয়াইন ঝিরি থেকে উৎপন্ন হয়েছে ঝরনাটি। সেখানে যাওয়ার পথটিও ভ্রমণের আলাদা এক আকর্ষণ। প্রথমে পাহাড়ি সড়ক ধরে যেতে হয় আমতলী (লংঘাট) বাজারে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় টোয়াইন খাল পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় দোছড়ি বাজারে।
টোয়াইন খালের স্বচ্ছ জল আর দুই পাশে সারি সারি পাহাড় নৌযাত্রাটিকে করে তোলে উপভোগ্য। নৌকার ছুটে চলার সঙ্গে বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। কখনো খালের শান্ত জল, কখনো পাহাড়ের ঢালে ঘন সবুজ। শহুরে ব্যস্ততা থেকে দূরে এ পথটুকুই যেন ভ্রমণের প্রথম অধ্যায়।
দোছড়ি বাজারের সেনা ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়ার পর স্থানীয় গাইডের সহায়তায় শুরু হয় মূল অভিযাত্রা। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেকিং করতে হয়। পথ কখনো উঁচু, কখনো নিচু। কোথাও মাটির পথ, কোথাও ছড়ার পানির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। পিচ্ছিল পাথর আর দুর্গম পথ পেরিয়ে এগিয়ে চলার সময় শরীরে ক্লান্তি আসে ঠিকই, কিন্তু চারপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য সেই ক্লান্তিকে অনেকটাই আড়াল করে দেয়।
দীর্ঘ হাঁটার পর হঠাৎই সামনে খুলে যায় অন্য এক দৃশ্য। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে থানকোয়াইন ঝরনার স্বচ্ছ জল। নিচে তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক জলাধার। আবহাওয়া ও পানির স্রোত অনুকূলে থাকলে সেখানে নেমে শীতল জলে শরীর জুড়িয়ে নেওয়া যায়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা ভ্রমণকারীদের কাছে সেই মুহূর্তটিই হয়ে ওঠে পুরো অভিযাত্রার সার্থকতা।
থানকোয়াইনের সৌন্দর্যের বড় আকর্ষণ এর নির্জনতা। এখানে নেই পর্যটনকেন্দ্রের ভিড় বা কোলাহল। পাহাড়, ঝিরি আর ঝরনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক শান্ত পরিবেশ। কিছুক্ষণ বসে ঝরনার শব্দ শোনা, কিংবা পাহাড়ের সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকাও হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ।
তবে দুর্গম এ গন্তব্যে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি জরুরি। পাহাড়ি ও পিচ্ছিল পথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপের জুতা সঙ্গে রাখা উচিত। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, পাওয়ার ব্যাংক ও ফার্স্ট এইড কিট রাখা ভালো। বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়া ও খালের পানির স্রোত বেড়ে যেতে পারে। সে সময় ঝরনা ও খালের কাছে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রকৃতির এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন প্রকৃতির ক্ষতি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট কিংবা অন্য কোনো বর্জ্য পাহাড়, ঝিরি বা ঝরনার আশপাশে ফেলে যাওয়া উচিত নয়। নিজের তৈরি বর্জ্য সঙ্গে ফিরিয়ে আনাই হতে পারে প্রকৃতির প্রতি সবচেয়ে ভালো দায়িত্বশীলতা।
থানকোয়াইনে যাওয়ার পথ হয়তো সহজ নয়। কিন্তু পাহাড়ি পথের রোমাঞ্চ, টোয়াইন খালের নৌভ্রমণ, সবুজের নিস্তব্ধতা আর শেষে ঝরনার শীতল জল মিলিয়ে এ যাত্রা হয়ে উঠতে পারে ভিন্নরকম এক অভিজ্ঞতা। যারা ভিড় এড়িয়ে পাহাড়ের একটু গভীরে গিয়ে প্রকৃতিকে অনুভব করতে চান, তাদের ভ্রমণ তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে থানকোয়াইন ঝরনা।





