মেঘের দেশ মারাইংতং

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে আসে সাদা মেঘ
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, হাত বাড়ালেই বুঝি ছোঁয়া যাবে মেঘ। ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে আসে সাদা মেঘ। নিচে সবুজ পাহাড়ের ভাঁজ, আঁকাবাঁকা মাতামুহুরী নদী আর দূরের পাহাড়ের সারি মিলে তৈরি হয় মুগ্ধকর এক দৃশ্য।
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মারাইংতং পাহাড়ে গেলে প্রকৃতির এ রূপই চোখে পড়ে।
মিরিঞ্জা রেঞ্জের প্রায় ১ হাজার ৬৪০ ফুট উচ্চতার মারাইংতং প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পরিচিত একটি গন্তব্য। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বড় একটি বুদ্ধমূর্তি। চারপাশ খোলা থাকায় চূড়ায় উঠলে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ভূদৃশ্য চোখে পড়ে।
মারাইংতংয়ের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে ভোরে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভেসে বেড়ায় মেঘ। কখনো মনে হয়, পাহাড়গুলো মেঘের সাগরে ভাসছে। মেঘ সরে গেলে দেখা যায় সবুজে মোড়া পাহাড়ের সারি, ফসলের মাঠ ও মাতামুহুরী নদীর আঁকাবাঁকা পথ। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পাহাড়ের রঙ। বিকালের শেষ আলোয়ও পাহাড় জুড়ে তৈরি হয় অন্যরকম মায়া।
তবে মারাইংতংয়ের আকর্ষণ শুধু চূড়ায় নয়, সেখানে ওঠার পথেও। পাহাড়ি ট্রেইল ধরে হাঁটতে গিয়ে কখনো ঘন সবুজ, কখনো খোলা ঢাল, আবার কখনো পাহাড়ের ভাঁজে ছোট ছোট জনপদ দেখা যায়। আলীকদম উপজেলা আবাসিক এলাকার দিক থেকে স্থানীয় গাইড নিয়ে পাহাড়ে ওঠার ব্যবস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি ভ্রমণ গাইডে চূড়ায় উঠতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হাঁটার গতি, আবহাওয়া ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর সময় কমবেশি হতে পারে।
পাহাড়ে ওঠার সময় তাড়াহুড়া না করে ধীরে চলাই ভালো। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার ও ভালো গ্রিপের জুতা রাখা প্রয়োজন।
মারাইংতংয়ের পাহাড়ি ভাঁজে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতি। ত্রিপুরা, মারমা ও ম্রো জনগোষ্ঠীর বসতিগুলো এখানকার জনপদের জীবনযাত্রায় এনেছে আলাদা বৈচিত্র্য। তাই ভ্রমণের সময় স্থানীয় মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
একসময় মারাইংতংয়ের টেন্ট ক্যাম্পিং পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। পাহাড়ের সমতল চূড়ায় তাঁবু, চারপাশে পাহাড় আর মাথার ওপর রাতের আকাশের অভিজ্ঞতা নিতে অনেকেই এখানে আসতেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও পাহাড়চূড়ায় টেন্ট ক্যাম্পিং নিয়ে নতুন উদ্যোগের কথা এসেছে। তবে ক্যাম্পিং ও রাতযাপনের অনুমতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই রাত কাটানোর পরিকল্পনা থাকলে যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
মেঘ দেখতে চাইলে বর্ষার শেষভাগ থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো অভিজ্ঞতা মিলতে পারে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে শীতকালে দূরের পাহাড় ও নিচের জনপদের বিস্তৃত দৃশ্য আরও স্পষ্ট দেখা যায়। তবে পাহাড়ের আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে পারে। বর্ষায় পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে যাত্রা করা এবং স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদমগামী বাসে যাওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে কক্সবাজারগামী বাসে চকরিয়ায় নেমে সেখান থেকে স্থানীয় বাস, জিপ বা চাঁদের গাড়িতে আলীকদম যাওয়া যায়। ভাড়া ও যানবাহনের ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে বর্তমান তথ্য জেনে নেওয়া ভালো।
মারাইংতংয়ে গিয়ে মেঘ দেখা, পাহাড়ের ছবি তোলা কিংবা সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। তবে ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি প্রকৃতিকে অক্ষত রাখার দায়িত্বও রয়েছে। পাহাড়ে প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট ফেলে যাওয়া উচিত নয়। ধর্মীয় স্থানে শালীনতা বজায় রাখতে হবে। স্থানীয় মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া এবং পাহাড়ি পথে দলবদ্ধভাবে চলাও জরুরি।
শহরের কোলাহল থেকে দূরে, যেখানে মেঘ এসে পাহাড়ের কাঁধে বসে, সেই জায়গার নাম মারাইংতং। চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন নিচের পাহাড়গুলো মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায়, তখন কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়, ব্যস্ত পৃথিবীটা যেন অনেক নিচে পড়ে আছে।






