এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পাহাড়ের কোলে ছবির মতো সাজানো এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম

মাওলিননং গ্রাম শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিচ্ছন্নতার জন্যও সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। ছবি: আগামীর সময়
‘এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে...’ কবিতার এই পঙ্ক্তির মতোই যেন মেঘ নেমে আসে পাহাড়ের কোলে। সবুজে ঢাকা পথ, বাঁশের ডাস্টবিন, ফুলে সাজানো উঠোন। কোথাও এক টুকরো আবর্জনাও নেই। ভারতের মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড়ের মাওলিননং গ্রাম তাই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিচ্ছন্নতার জন্যও সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে।
মেঘালয়ের পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে হঠাৎ বদলে যায় চারপাশ। রাস্তার ধারে পড়ে নেই প্লাস্টিক, কাগজ বা খাবারের প্যাকেট। বাঁশের ডাস্টবিনে জমা হচ্ছে বর্জ্য। ফুলে সাজানো পথ আর সবুজে ঘেরা বাড়িঘর দেখে মনে হয়, এটি যেন কোনো ছবির ভেতর থেকে উঠে আসা গ্রাম। এই গ্রামই মাওলিননং, যাকে বহু বছর ধরে বলা হয় ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম’।
পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার পাইনুরসলা ব্লকের এই গ্রাম ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি। শিলং থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭৬ থেকে ৯০ কিলোমিটার। মেঘালয় পর্যটন বিভাগের তথ্যেও মাওলিননংকে পরিচ্ছন্নতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্থানীয় মানুষের পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের জন্য বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
কীভাবে এল ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম’-এর তকমা?
মাওলিননংকে ২০০৩ সালে ভ্রমণবিষয়ক সাময়িকী ‘ডিসকভার ইন্ডিয়া’ ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত করে। পরে ২০০৫ সালে একই সাময়িকীতে এটি ভারতের সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম হিসেবেও উঠে আসে।
তবে এই পরিচিতির পেছনে শুধু কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই। গ্রামের মানুষের কাছে পরিচ্ছন্নতা দীর্ঘদিনের সামাজিক অভ্যাস। প্রত্যেকেরই নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদেরও এ বিষয়ে শেখানো হয়। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় বাঁশের তৈরি ডাস্টবিন রাখা হয়েছে। সেখান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে আলাদা করা হয়। পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি হয় সার। প্লাস্টিক ব্যবহার ও ধূমপানও নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। মেঘালয় পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মাওলিননংয়ের পরিচ্ছন্নতার চর্চার সঙ্গে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও যুক্ত।
পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে মাওলিননংয়ের সৌন্দর্যও নজর কাড়ে
পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে মাওলিননংয়ের সৌন্দর্যও যেন হাত ধরাধরি করে চলে। ফুলে সাজানো পথ, সবুজে ঢাকা বাড়িঘর আর বাঁশের তৈরি নানা কাঠামো মিলিয়ে জায়গাটিকে বলা হয় ‘গডস ওন গার্ডেন’। কাছেই রয়েছে রাইওয়াইয়ের বিখ্যাত জীবন্ত শিকড়ের সেতু। বাঁশের তৈরি উঁচু দর্শনমঞ্চ থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের সমতলভূমি। গ্রামের চারপাশের সবুজ পাহাড়, ফলের বাগান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মাওলিননংকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
সারাবছর পর্যটকদের আনাগোনা
পরিচ্ছন্নতার খ্যাতির সঙ্গে বেড়েছে পর্যটকের আনাগোনাও। আপনার দেওয়া মেঘালয় পর্যটন দফতরের তথ্যভিত্তিক হিসাবে, ২০২৩ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাওলিননংয়ে ৫২ হাজার ২৬৪ জন পর্যটক গিয়েছিলেন। অক্টোবরেই পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯৩৮ জন, আর মে মাসে ৯ হাজার ৭৮৮ জন। পর্যটন এখন গ্রামের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৪ সালের হিসাবে সেখানে ছিল ১১টি অতিথিশালা, ২৭টি হোমস্টে, সাতটি রেস্তোরাঁ, ছয়টি চায়ের দোকান ও ২৫টি সাধারণ পণ্যের দোকান। পর্যটননির্ভর নানা কাজের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।
আউটলুক ট্র্যাভেলার অ্যাওয়ার্ডস
মাওলিননংয়ের পরিচ্ছন্নতা শুধু পর্যটকদের দেখানোর জন্য নয়, এমনটাই মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মেঘালয়ের একটি সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামের কমিটি পরিচ্ছন্নতা ও বাগান দেখাশোনার কাজে প্রায় ২৫ জনকে নিয়োজিত রাখে। ব্যস্ত মৌসুমে দিনে প্রায় এক হাজার পর্যটকও গ্রামে আসেন। ২০২২ সালে ‘আউটলুক ট্র্যাভেলার অ্যাওয়ার্ডস’-এ ‘ভারতের সেরা পরিবেশবান্ধব পর্যটন গন্তব্য’ বিভাগে রুপার পুরস্কারও পেয়েছিল মাওলিননং।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের গাড়ির চালক লাম সিয়াম আগামীর সময়কে বলেন, ‘বাইরের মানুষ এসে আমাদের গ্রাম পরিষ্কার করে দেবে, এমনটা আমরা কখনও ভাবিনি। ছোটবেলা থেকেই এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখেই শিখেছি, গ্রামটা আমাদের, তাই পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও আমাদের।’
মেঘ, পাহাড় আর সবুজের মধ্যে তাই মাওলিননং শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। ২০০৩ সালে পাওয়া একটি পরিচিতিকে বছরের পর বছর দৈনন্দিন অভ্যাসে ধরে রাখার গল্পও এই গ্রামের।







