পুরনো মেশিনারির আড়ালে ‘গাড়ির যন্ত্র-ইলেকট্রিক বাইক’
- তিন মাসে ধরা পড়েছে এমন ১০ চালান
- সন্দেহজনক ৮৩ কনটেইনার চিহ্নিত

সংগৃহীত ছবি
কোনো একটি দেশ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে পণ্যবোঝাই কনটেইনার। সঙ্গে থাকা কাগজপত্র বলছে, এর ভেতরে রয়েছে টেক্সটাইল মেশিনারি। খুলতেই কনটেইনারের সামনে দেখাও গেল পুরনো-জীর্ণ টেক্সটাইল মেশিন। কিন্তু এরপরই একে একে বের হলো নাট-বোল্ট থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক বাইক, স্কুটি ও থ্রি-হুইলারের যন্ত্রাংশ, স্টিল স্ট্রাকচার; এমনকি কাঠের স্ক্রু পর্যন্ত! অর্থাৎ কাস্টমসকে বিভ্রান্ত করতে আর শুল্ক ফাঁকি দিতেই এ ব্যবস্থা। কেননা, পুরনো এসব মেশিনের শুল্ক বড়জোর ১ থেকে ২ শতাংশ। এসবের পেছনে রাখা হচ্ছে ১২৩ শতাংশের উচ্চশুল্কের পণ্য। এমনকি একটি চালানে পাওয়া গেল আমদানিনিষিদ্ধ অপরিশোধিত লবণ বা সি-সল্টও। অবশ্য কনটেইনার খুলেই বোঝার উপায় নেই পেছনে এত দামি পণ্য আছে। আর এই কৌশল ব্যবহার করেই মেশিনারি অজুহাতে কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই বন্দর থেকে ছাড় পেয়ে যায় অনেক দামি পণ্য।
গত মে মাসে কাস্টমস গোয়েন্দা দলের (এআইআর) ধরা একটি চালানের মাধ্যমে বিষয়টি নজরে আসে। এরপর একে একে ধরা পড়ে বেশ কয়েকটি চালান, ফাঁস হয় প্রতারণার এই কৌশল। গত তিন মাসে এ ধরনের ১০টি চালান ধরা পড়েছে কাস্টমসের হাতে। প্রতি চালানে অন্তত দেড় কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে। একই কৌশলে আনা আরও ৮৩ কনটেইনার পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলো বন্দর থেকে ছাড় করা থামিয়েছে কাস্টমস। যেগুলো রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপকমিশনার ও এআইআর প্রধান তারেক মাহমুদ বলছিলেন, ‘অনেক দিন ধরে এই কৌশলে চালানগুলো খালাস হচ্ছিল। কায়িক পরীক্ষায় একের পর এক অনিয়ম ধরা পড়ে। নতুন করে সন্দেহজনক ৮৩ কনটেইনার আমরা চিহ্নিত করেছি। সবগুলো কনটেইনার খুলে কায়িক পরীক্ষা বা গণনার জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে বলেছি। তারা সাড়া না দিলে ফোর্স কিপডাউন বা জোর করে কনটেইনার খুলে সবার উপস্থিতিতে পরীক্ষা করা হবে।’
অভিনব এই জালিয়াতির নেপথ্যে আছে একটি জেলাভিত্তিক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। আর সেই জেলার নাম নরসিংদী। কারণ, এখন পর্যন্ত আটক পণ্য চালানের প্রায় সবগুলোরই আমদানিকারক নরসিংদী শিল্প এলাকার। তাদের সঙ্গে চট্টগ্রামভিত্তিক একদল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টও দীর্ঘদিন ধরে জড়িত এই জালিয়াতির সঙ্গে।
চালান ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ পণ্য আটক, শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা কাস্টমসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় বিষয়টি জেনে পদক্ষেপ নেওয়ায় পণ্য খালাস আটকে যায়। বর্তমানে কাস্টমস কর্মকর্তাদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি চলছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পণ্য খালাসের তদবির।
আটক ১০টি চালানে বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছে। তবে এর পরিমাণ কত, তা জানাতে পারেনি কাস্টমস। আমদানিকারকরা ব্যাংকিং চ্যানেলে শুধু কম শুল্কের পুরনো যন্ত্রপাতির জন্য সামান্য বৈদেশিক মুদ্রা ঋণপত্র হিসেবে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত পণ্য বা ইলেকট্রিক স্কুটি কেনার বাকি সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডিচক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে রপ্তানিকারককে পরিশোধও করেছেন।
তবে এর দায় নিচ্ছে না সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। আনাতুল হাসান সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল হক বললেন, ‘টাকা পাচার করলে আমদানিকারকরা করেছেন, এখানে আমার করণীয় কিছু নেই।’
কাস্টমস কর্মকর্তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কাস্টমস যে ১০টি চালান আটক করেছে, সেগুলোর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হলো— মেসার্স জাহিদ টেক্সটাইল, ইউনিস্টার টেক্সটাইল, মা টেক্সটাইল, অ্যামিগো পলিফাইবার কোম্পানি লিমিটেড, মেসার্স রিমি সরকার দোয়া টেক্সটাইল, মেসার্স এস এন টেক্সটাইল, মেসার্স রোহান টেক্সটাইল, মেসার্স ফাতেমা টেক্সটাইল, উর্মি টেক্সটাইল এবং রোলেক্স টেক্সটাইল। এর মধ্যে আটটিই নরসিংদীর।
কর্মকর্তারা বলছেন, ‘এ জেলা দেশের অন্যতম টেক্সটাইল হাব হওয়ায় লাইসেন্স ও বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহার করা সহজ। এ মিলগুলোর নামে ভুয়া ঘোষণায় পণ্য এনে তা স্থানীয় বাজারে অবৈধভাব চড়া দামে বিক্রি করাই চক্রের মূল উদ্দেশ্য।’
কাস্টমস গোয়েন্দা দল এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টগুলোকেও খুঁজে বের করেছে। এগুলো হলো— আবির ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কোস্টাল ট্রেডিং কোম্পানি, ইভা এন্টারপ্রাইজ, এন জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আনাতুল হাসান সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড, জিয়ান এন্টারপ্রাইজ, অফিস ওয়ান লিমিটেড এবং টায়ার মাস্টার লিমিটেড।
নরসিংদী সদরের প্রতিষ্ঠান এম এ টেক্সটাইল পুরনো মেশিনারি ঘোষণায় ইলেকট্রিক বাইক পর্যন্ত এনে ৫৫ লাখ টাকা জরিমানা গুনেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিঅ্যান্ডএফ চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের এন জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক গোলাম নবী বলছেন, ‘আমদানিকারক কী এনেছেন, আমি কীভাবে জানব? আর আমরা জড়িত থাকলে তো কাস্টমস জরিমানা থেকে লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল করতে পারত।’
পুরনো মেশিনারি ঘোষণায় উচ্চশুল্কের পণ্য এনে এক চালানে ১ কোটি টাকা জরিমানা গুনেছেন নরসিংদীর ইউনিস্টার টেক্সটাইল। জরিমানা পরিশোধ করে চালানটি বন্দর থেকে ছাড় নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সিঅ্যান্ডএফ চট্টগ্রামভিত্তিক কোস্টাল ট্রেডিং কোম্পানির অংশীদার শামসুল কবির বললেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা প্রথম কাজ করেছি। প্রথম কাজেই সুনাম গেল।’
কয়েকজন বন্দর ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলছেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠানের বিআইএন ব্যবহার করে বারবার এসব ভুয়া চালান আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের মাধ্যমে সেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও আসল মালিকদের খুঁজে বের করা সহজ। তাদের চিহ্নিত করা গেলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে সুনামের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।’
যেহেতু নরসিংদীর নাম বারবার আসছে, তাই বিষয়টি জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট রাশিদুল হাসান রিন্টুর সঙ্গে। কিন্তু তাকে কয়েকবার টেলিফোন করলেও সাড়া মেলেনি।



