আর্জেন্টিনার জয় দেখতে নির্ঘুম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

আর্জেন্টিনা- কেপ ভার্দের ম্যাচ দেখতে ট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। ছবি: আগামীর সময়
টানটান উত্তেজনায় ভরা ম্যাচ। বেঁচে থাকার শেষ ৩২-এর লড়াই। গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি নবাগত দল কেপ ভার্দে। রাতটা যেন আর পাঁচটি রাতের মতো ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, ক্যাফেটেরিয়া, শহীদ মিনার চত্বর কিংবা জিরো পয়েন্টের মোড় সবখানে একটাই রঙ, একটাই আবেগ। আকাশি-সাদা পতাকার ঢেউ, মেসির জার্সি, আর হাজারো কণ্ঠে একই প্রার্থনা 'জিততেই হবে আর্জেন্টিনাকে।'
যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামির স্টেডিয়ামের উত্তেজনা যেন ভর করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। শহীদ মিনার চত্বরের বড় পর্দায় চোখ সবার। রাত জেগে অপেক্ষা কখন ভোর ৪টা বাজবে। উদ্বেগ আর স্বপ্নে ডুবে ছিলেন শত শত শিক্ষার্থী। বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ যেন প্রতিবারের মত এবারও ছুঁয়ে গেছে ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ।
শুরুর বাঁশি বাজতেই শুরু হয় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হৃদস্পন্দন। আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে যেমন উত্তেজনা তেমনি প্রতি আক্রমণের ভয়-শঙ্কাও ছিল তাদের মুখাবয়বে। প্রতিটি পাসে উচ্ছ্বাস, প্রতিটি আক্রমণে নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া। ২৯তম মিনিটে অধিনায়ক লিওনেল মেসি বল জালে জড়াতেই বাঁধভাঙা উল্লাস। হর্ষধ্বনি আর করতালিতে কেঁপে ওঠে ক্যাম্পাস। বন্ধুরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। গানের তালে নাচতে থাকেন। আকাশি-সাদা পতাকা উড়তে থাকে রাতের বাতাসে। মনে হচ্ছিল, জয় বুঝি হাতের মুঠোয়।
আর্জেন্টিনার সমর্থক গাদ্দাফি বললেন, ‘প্রথম গোলের সঙ্গে সঙ্গে এমন লাফ দিয়েছি যে, আমি গিয়ে তিনজনের ওপর পড়লাম।‘
কিন্তু ফুটবলের গল্প তো কখনোই এত সহজ নয়। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৯তম মিনিটে দেরয় দুয়ার্তের সমতাসূচক গোলে মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কিছুক্ষণ আগেও যে ক্যাম্পাস ছিল উল্লাসে মুখর, সেখানে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। চোখ স্ক্রিনে স্থির। কেউ আবার দুই হাত তুলে প্রার্থনায় মগ্ন। সময় গড়াতে থাকে, বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠাও।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখন যেন প্রতিটি মিনিট একেকটি যুগ। ৯৩তম মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের গোলে আবারও আশার আলো জ্বলে ওঠে। আনন্দে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা। কিন্তু সেই হাসিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ১০৩তম মিনিটে লপেস ক্যাব্রালের গোলে আবার সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। তখন মাঠের লড়াইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্যাম্পাসেও শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ। সবাই বুঝতে পারছিলেন, একটি ভুলই বদলে দিতে পারে পুরো গল্প।
শেষ পর্যন্ত সেই গল্পের আনন্দময় সমাপ্তি ঘটে অতিরিক্ত সময়ের ১১১তম মিনিটে। মেসির কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে হেড করার জন্য রোমেরো ও কেপ ভার্দের খেলোয়াড় লাফিয়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত বল জাল খুঁজে নেয়। ডিনেইয়ের আত্মঘাতি গোল। আবার বিস্ফোরণ ঘটে পুরো ক্যাম্পাসে। চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে 'আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা' স্লোগান। কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ বন্ধুদের কাঁধে উঠে বিজয় উদযাপন করেছেন।
শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও জেগে ছিলেন ক্যাম্পাসের বড়পর্দায় প্রিয় দলের জয় দখতে। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা শেফা বলেই ফেললেন, ‘যে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ দেখলাম তাতে রাতজাগা সার্থক হয়েছে। প্রিয়দল জিতেছে। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কি হতে পারে।’
ভোরের আলো ফুটেছে, তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডায় ঘুরে ফিরেছে একটাই আলোচনা মেসির জাদু, আর আর্জেন্টিনার জয়। ফুটবল যে শুধু একটি খেলা নয়, বরং অনুভূতি, ভালোবাসা আর সকলকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নির্ঘুম রাত আবারও তার সাক্ষী হয়ে রইল।






