সীমান্ত পেরিয়ে চট্টগ্রামে
ফেনসিডিলের জায়গা নিচ্ছে ফেয়ারডিল
- ফেনসিডিলে নজরদারি ও উচ্চমূল্যের কারণে একই উপাদানে তৈরি সিরাপে ‘ফেয়ারডিল’ লেবেল লাগিয়ে বাজারজাত

সংগৃহীত ছবি
দেশে মাদক হিসেবে নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের মতোই কাশির এক সিরাপ ‘ফেয়ারডিল’। দুটিই কোডিন ফসফেট মিশ্রিত। দেখতেও একই। শুধু মোড়ক আলাদা। এক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যাচ্ছে এ সিরাপ। গত শনিবার রাতে মিরসরাই থানায় প্রথমবার জব্দ হয়েছে ১০০ বোতল। এটিচট্টগ্রামে জব্দ হওয়া ফেয়ারডিলের প্রথম চালান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে ফেয়ারডিলের। দেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢুকছে মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকর এ সিরাপ। এখনো ফেয়ারডিলের বিস্তার রমরমা হয়ে না উঠলেও দ্রুত সহজলভ্য হচ্ছে এটি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক হুমায়ুন কবীর খোন্দকার আগামীর সময়কে বললেন, ‘ফেনসিডিল, ফেয়ারডিলসহ আরও কয়েক ধরনের কফ সিরাপ আছে। এগুলো সব একই। ফেয়ারডিল নামটা বাজারে নতুন। ফেনসিডিল ব্র্যান্ড হয়ে গেছে। সেজন্য এ নামটা বেশি শোনা যায়। সবগুলো সিরাপই ক্ষতিকর কোডিন ফসফেট দিয়ে তৈরি। সাধারণত ১০০ মিলিগ্রাম সিরাপে ১০ মিলিগ্রাম কোডিন ফসফেট থাকে।’
কর্মকর্তাদের ধারণা, ফেনসিডিল বেশি পরিচিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি আছে এ মাদকের প্রতি। এ ছাড়া উচ্চমূল্যের কারণেও নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের বিকল্প বাজার তৈরি হয়েছে দেশে। র্যাব-পুলিশের দৃষ্টি এড়িয়ে সেই বিকল্প বাজার ধরতে একই সিরাপের বোতলে ফেয়ারডিল মোড়ক লাগিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে মাদক কারবারিরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে এ পর্যন্ত দেশে ২৪ ধরনের মাদক জব্দ হয়েছে। এর মধ্যে ইয়াবা-হেরোইনের মতো মরণনেশা যেমন আছে, কোডিন ফসফেট মিশ্রিত কাশির সিরাপও আছে। গত এক দশকে এস্কাফ, এমকে, ফেনসিগ্রিপ, চকো প্লাস, উইন কোরেক্স, ব্রনোকফ সিসহ আরও কিছু কাশির সিরাপ জব্দ হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। যেগুলো মূলত ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে ফেয়ারডিল।
২০২৫ সালের জুনে নওগাঁয় বিজিবির হাতে ৭৪ বোতল ফেয়ারডিলের একটি চালান ধরা পড়ে। এর পর থেকে গত এক বছরে কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট ও কুমিল্লার ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জব্দ হয়েছে ফেয়ারডিলের অর্ধশতাধিক চালান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মানজুরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘আমাদের দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে কোডিন বেজড সিরাপ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে গণ্য। সুতরাং দেশে ফেয়ারডিলের মতো সিরাপ উৎপাদনের সুযোগ নেই। আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছি, আমাদের দেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতের এলাকায় কিছু কিচেন ল্যাব বা ছোট ছোট মাদক কারখানা আছে। সেখানে কোডিন ফসফেট মিশ্রিত সিরাপ তৈরি হয়। বর্ডারে বিক্রির পর চোরাচালানিরা সেগুলো আমাদের দেশে নিয়ে আসছে।’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তপথ। মিয়াননমারের সঙ্গে আছে ২৭১ কিলোমিটার। উভয় দেশ থেকেই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটে মাদকের।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেশের সীমান্তসংলগ্ন ৩২ জেলাকে মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী ও নওগাঁয় ফেনসিডিল প্রবেশের কথাও বলা হয়। তবে ভারত সীমান্তের ৫০ কিলোমিটার এলাকায় ফেনসিডিল এবং এটি তৈরির উপকরণ সরবরাহ, বহন ও উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে।
মানজারুল ইসলামের ভাষ্য, ‘ফেনসিডিল নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ হলেও ভারতে কোডিন ফসফেট মিশ্রিত সিরাপ লিগ্যাল আইটেম (আইনিভাবে বৈধ)। আমাদের দেশে ফেয়ারডিল কিংবা অন্য যেসব কাশির সিরাপ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো শুধু ভারত থেকেই আসছে। মিয়ানমার থেকে আসে ইয়াবা, হেরোইন আর ক্রিস্টাল মেথ। ফেয়ারডিল সিরাপ ভারতের বৈধ কোনো কারখানায় উৎপাদন হয় কি না, সেটি আমরা এখনো নিশ্চিত নই। কিচেন ল্যাবের সিরাপগুলো বিভিন্ন নামে লেবেল লাগিয়ে পাচার করা হয়।’
ফেয়ারডিল কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার কথা জানালেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। বললেন, ‘মিরসরাইয়ে ১০০ বোতল ফেয়ারডিল উদ্ধার হয়েছে। আমাদের জানামতে চট্টগ্রামে আগে ফেয়ারডিল উদ্ধার হয়নি। নতুন এ মাদক কোথা থেকে কীভাবে, কাদের মাধ্যমে আসছে এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা আমরা তদন্ত করে দেখছি।’
জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. এ কে এম আরিফ উদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে জানালেন, অনিয়ন্ত্রিত কফ সিরাপ সেবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া, লিভার-কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।






