৫৬ দিনের ভিসির পাশে পুরো চুয়েট

ছবি: আগামীর সময়
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিতে সচরাচর আন্দোলন করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। কিন্তু সরকারের বাদ দেওয়া একজন উপাচার্যকে স্বপদে ফিরিয়ে আনতে ছাত্রদের আন্দোলন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এক নজিরবিহীন ঘটনা। এমন নজির সৃষ্টি হলো চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ২৭ জুলাই চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য পদে নিয়োগ পান যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। কিন্তু ৫৬ দিনের মাথায় গত সোমবার সন্ধ্যায় হঠাৎ এক সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, তিনি আর উপাচার্য নেই। তার পরিবর্তে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম এখন থেকে চুয়েটের উপাচার্য।
শিক্ষক হিসেবে আগে থেকেই চুয়েটে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন অধ্যাপক সায়েম। উপাচার্য হয়ে অল্পদিনেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। হঠাৎ কী ‘অপরাধে’ তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো, জানতে পারলেন না কেউ-ই। ক্ষুব্ধ হাজারো শিক্ষার্থী রাতেই আন্দোলনে নেমে পড়লেন। সকাল থেকেই তাদের পাশে দাঁড়ালেন শিক্ষকরাও। কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে এক কাতারে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন অধ্যাপক সায়েমের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনে অচল হয়ে পড়ল দেশের অন্যতম শীর্ষ এ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘অধ্যাপক সায়েম নিশ্চয়ই চুয়েট ক্যাম্পাসকে শিক্ষার্থীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলছিলেন। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রেখেছিলেন। নিশ্চয়ই উনার সদিচ্ছা দেখেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উনার ওপর আস্থা রেখেছেন। উনি নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ অ্যাকাডেমিশিয়ান। হঠাৎ উনাকে যে পন্থায় সরিয়ে দেওয়া হলো, এটার নজির নেই। এজন্য ছাত্রছাত্রীরা উদ্বেগ ও হতাশা থেকে আন্দোলন করছে। চ্যান্সেলর, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির দপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে, গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত ক্যাম্পাসকে স্থিতিশীল করা।’
গতকাল মঙ্গলবার সকালে চুয়েট শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে দাঁড়ানো এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বললেন, পদত্যাগের পরিবর্তে ভিসিকে রাখার জন্য এমন সর্বজনীন আন্দোলন পাবলিক ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে থাকবে।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে বিবৃতিও দেন। চুয়েট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরাম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মকবুল হোসেনও একইভাবে বিবৃতি দিয়ে তাকে বহালের দাবি জানান। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীবৃন্দ বিবৃতি দিয়ে তাকে পুনর্বহালের দাবি তুলেছেন।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বললেন, ‘ভিসি হিসেবে সায়েম স্যার শুরু থেকেই সবাইকে আশাবাদী করেছিলেন। মাত্র কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এত সুন্দর আয়োজন হলো। অর্থমন্ত্রী এবং আরও তিন-চারজন এমপি এসেছিলেন। হঠাৎ এমন কী অঘটন ঘটল যে, উনাকে সরিয়ে দিতে হলো, আমরা জানি না। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের কাছেও এটা দুঃস্বপ্নের মতো।’
সোমবার রাতে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে হাজারো ছাত্রছাত্রী বেরিয়ে চুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ করেন। উপাচার্য ভবনে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। লিখে দেওয়া হয়— ‘এই তালা শুধু সায়েম স্যার খুলতে পারবেন’। এরপর গতকাল সকাল থেকে শুরু হয় মূল ফটকে তালা লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির মধ্যে চুয়েটের মূল ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা।
চুয়েটের মেটারিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল বিভাগের চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র আবদুল্লাহ মাহমুদ সাজিদ বললেন, ‘সায়েম স্যারকে ভিসি হিসেবে পুনর্বহালের প্রজ্ঞাপন না আসা পর্যন্ত সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি চলবে। অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, ক্লাস-পরীক্ষা, ল্যাব বন্ধ থাকবে। তবে নিরাপত্তা শাখা ও মেডিকেল সেবা কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে উপাচার্য ভবন, শহীদ মিনার, মেইন গেটের সামনে গণঅবস্থান ও বিক্ষোভ চলবে। আমাদের দাবি একটাই। আমরা স্যারকে চাই।’
হঠাৎ অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো কেন, তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন তিনি। সেখানে বসেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার খবর পান। গতকাল সকালে ঢাকা থেকে ফিরে দুপুরে সরাসরি চুয়েট ক্যাম্পাসে যান। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। এ সময় ‘সায়েম স্যার, সায়েম স্যার’, ‘দাবি মোদের একটাই, সায়েম স্যারকে ফেরত চাই’— এমন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানাচ্ছিলেন, ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী কয়েক দিন ধরে অধ্যাপক সায়েমকে আওয়ামী লীগের দালাল, ফ্যাসিবাদের দোসর বলে প্রচার করছিলেন। এর মধ্যেই তাকে অপসারণের খবর আসে। এমন আলোচনাও চলছে, চুয়েট ছাত্রদলের এক নেতার তদবির রক্ষা না করায় তাকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুয়েটের ভিসি পদ নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন প্রবীণ নেতা ও একজন তরুণ কেন্দ্রীয় নেতার দ্বন্দ্বের খবরও আলোচিত হচ্ছে।
সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকার আমাকে নিয়োগ দিয়েছিল। সরকারই আবার আমাকে সরিয়ে নিয়েছে। আমার এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই।’
আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেন। জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং টেকসই বিজ্ঞানে (সাসটেইনেবিলিটি সায়েন্সেস) স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা করেন। এরপর তিনি অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্রকৌশলে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণা করেছেন।
অধ্যাপক সায়েমের হাত ধরে চুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগ টানা চারবার মর্যাদাপূর্ণ কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে স্থান পায়। ২০২৬ সালে বিভাগটি বিশ্বে ১৫৫তম অবস্থানে পৌঁছে। ক্লিন এনার্জি সিস্টেম, টেকসই বিজ্ঞান, লিথিয়াম-এয়ার ব্যাটারি এবং নির্গমন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নাল ও কনফারেন্সে তার ৭১টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ এবং দুটি বই প্রকাশ হয়েছে।





