সবাইকে কাঁদিয়ে ডেঙ্গুতে হার মানল কিশোরটি

অভি বড়ুয়া
বিহারে জ্বলল হাজার প্রদীপ। প্রার্থনায় বসেছিল সাতকানিয়ার উত্তর পুরানগর গ্রামের শত শত নারী পুরুষ। সমাজমাধ্যম জুড়েও আশীর্বাদের আকুতি। শত সহস্র মানুষের প্রার্থনা, ভালোবাসা, শুভ কামনা উপেক্ষা করে অভি বড়ুয়া ঠিকেই চলে গেল না ফেরার দেশে।
আজ শুক্রবার সকালে আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই কিশোরের মৃত্যু হয়। সে নবম শ্রণিতে পড়ত। ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত অভিকে বাঁচানোর জন্য শত চেষ্টা চলেছে।
সপ্তাহখানেক আগে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর অভিকে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চারদিন আগে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। একপর্যায়ে তার কিডনি ডায়ালাইসিস শুরু করতে হয়। চিকিৎসক, বাবা মা আর স্বজনদের সপ্তাহখানেকের যুদ্ধ মিথ্যা হয়ে গেল।
চারদিন আগে অভির বাবা অসীম বড়ুয়া নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। ‘আমার ছেলে অভি বড়ুয়া এখন লাইফ সাপোর্টে। সবার কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ চাই’- কতটা অসহায় আর্তি একজন বাবার।
সন্তানের জন্য একজন বাবার এই আকুতির নিচে শত শত চেনা অচেনা মানুষ প্রার্থনা, আশীর্বাদ ও শুভ কামনা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন। শুধু বাবা মায়ের নয়, সবাই যেন নিজের সন্তানকে বাঁচাতে কাছে দূরে থেকে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছিলেন।
তিনদিন আগে বিহারে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। অভির কাকিমা রিচি বড়ুয়া প্রদীপ এবং সমবেত প্রার্থনার কয়েকটি ছবি দিয়ে আকুতি জানান। ইনসেটে ছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অভি বড়ুয়ার ছবি। রিচি লিখেছিলেন, ‘অভির দ্রুত সুস্থতা কামনায় বিহারে হাজার প্রদীপ জ্বালানো হয়। ভগবানের কাছে একটাই চাওয়া অভির প্রাণটা ভিক্ষা দাও ভগবান।’
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে শত শত লোক সেখানে কমেন্ট করে অভির সুস্থতা কামনা করেছেন। আরও কত কত লোক অভির সুস্থতা কামনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে আর্শীবাদ কামনা করেছেন তার অন্ত নেই।
কাকিমা রিচি বুধবার অভিসহ আরেকটি পারিবারিক ছবি দিয়ে স্রষ্টার কারছে ছেলেটির প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন, ‘ভগবান যেকোনো কিছুর বিনিময়ে অভিকে কি আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না? তুমি এতটা পাষাণ কি করে হতে পারছো হাজার হাজার মানুষের প্রার্থনা পূণ্যদান কেমনে বিফলে যেতে দিতে পারছো?তুমি চাইলেই তো পারো একটা প্রাণ ভিক্ষা দিতে। প্লিজ ভগবান তুমি একটা মিরাক্কেল করে দেখাও না।‘
শেষপর্যন্ত কোনো মিরাকেল হলো না। নিয়তিকে মেনে নিতে হলো তাদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দূর থেকে যারা অভির চিকিৎসার খোঁজ রাখছিলেন তারা রিচি কিংবা অন্য শুভান্যুধায়ীদের মাধ্যমে খবরটি জানতে পারেন।
রিচি বড়ুয়া ১১টার দিকে স্ট্যাটাস দিয়ে সংবাদটি জানান, ‘অভি এটা কি হয়ে গেল। কেমন করে বাঁচবো আমরা তোমাকে ছাড়া? কেমনে পারলে আমাদের এত ভালোবাসা ফেলে চলে যেতে। এখন তোমার বাবাকে আমরা বাঁচাবো কীভাবে?’
সত্যি অভিকে হারিয়ে বাবা অসীম বড়ুয়া ও মা পাপিয়া বড়ুয়া পাগলপ্রায়। অথচ এই কয়দিন আগেই এই সেপ্টেম্বরে অভির জন্মদিন গেল। বাবা অসীম বড়ুয়া ভালোবেসে নিজের ফেসবুকে অভির ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন।
তিনি লিখেছেন, ‘সময় কত দ্রুত চলে যায়! সেই ছোট্ট বাবাটা আজ আরও এক বছর বড় হয়ে গেল। তোমার জীবনের প্রতিটা নতুন বছর আগেরটার চেয়েও সুন্দর হোক। এই আশীর্বাদ রইল। শুভ জন্মদিন, বাবা।’
অভির আগামী বছর আর সুন্দর হলো কোথায়! ছেলের মরদেহ নিয়ে অসীম বড়ুয়াকে যে ফিরতে হলো গ্রামের বাড়িতে।



