দিনে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, রাতে বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি

গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও গুলিবর্ষণ করেন সন্ত্রাসীরা। সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম নগরীতে এবার প্রবাসীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা। বাড়ির মালিকের অভিযোগ, দুপুরে তার বিদেশফেরত ছেলেকে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ভয়েস রেকর্ড পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এক ব্যক্তি। নম্বরটি ব্লক করে দেওয়ার পর রাতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে তাদের ভবনের বাসিন্দাসহ পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল সোমবার রাত ১১টার দিকে নগরীর পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় হাজী মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটেছে।
মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায়। তার বড় ছেলে মোহাম্মদ শওকত দুবাইপ্রবাসী। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান আজিজের শ্বশুর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুদিন পর গ্রেপ্তার হয়ে আজিজ এখন কারাগারে আছেন।
পাঁচলাইশ থানার ওসি মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাতে হামজারবাগ এলাকায় একটি বাড়ি লক্ষ্য করে কে বা কারা দুই রাউন্ড গুলি করেছে। তখন সেখানে লোডশেডিং চলছিল। এই সুযোগে গুলি করা হয়েছে। পরে জানতে পেরেছি, সেটা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আজিজের শ্বশুরবাড়ি। ব্যবসায়ী শওকতের বাসা হিসেবে এলাকার লোকজন চেনে। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য এটা করা হয়েছে। কারা গুলি করেছে আমরা তা তদন্ত করে দেখছি।’
মোহাম্মদ ইউসুফ জানালেন, তিনি ৪০ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। এখন অবসর জীবনযাপন করছেন। বড় ছেলে শওকত দুবাইয়ে থাকেন। ব্যবসা করেন। বর্তমানে দেশে আছেন। ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন।
ইউসুফের ভাষ্য, বেলা পৌনে ১২টার দিকে শওকতের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিদেশি একটি নম্বর থেকে একটি ভয়েস রেকর্ড আসে। ভয়েজ রেকর্ডে বলা হয় যে, কাতার থেকে কল করা হয়েছে। বলা হয়, আমাদের দেশে-বিদেশে ব্যবসা আছে। বিল্ডিং আছে। অনেক টাকা ভাড়া পাই। ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। তার এক ছোট ভাইয়ের হাতে টাকাটা দিতে হবে। টাকা দিতে রাজি হলে যেন তাকে জানানো হয়। তারপর ওই ছোট ভাইয়ের মোবাইল নম্বর এবং টাকাটা কোথায় দিতে হবে সেটা জানাবেন।
চাঁদা দাবি করা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে আমাকে বিষয়টি জানাল। আমি বললাম, তোমার কোনো রিপ্লাই দেওয়ার দরকার নেই। নম্বর ব্লক করে দাও। সে নম্বর ব্লক করে দিল। এরপর রাত সাড়ে ১০টার পর দুজন লোক আমাদের বাসার সামনে এলো। নিচে আমাদের সিকিউরিটি গার্ড ছিল। গেট খোলা ছিল। আমরা দোতলায় বাসায় ছিলাম। গার্ডকে তারা বলল, গেট বন্ধ করে দিতে। একজনের হাতে অস্ত্র ছিল। গার্ড কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দিল। তখন গার্ড তাড়াতাড়ি গেট বন্ধ করে নিজের রুমে ঢুকে যায়। গেট বরাবর দুটা গুলি করে দুজনকে হেঁটে চলে যেতে দেখল আমাদের গার্ড।’
‘বিদ্যুৎ ছিল না। এজন্য সিকিউরিটি গার্ড দুজনের চেহারা ভালো করে দেখতে পারেনি। তবে তারা হেঁটে এসেছিল। আবার হেঁটে চলে যায়। সম্ভবত দূরে তাদের মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো গাড়ি রাখা ছিল। গুলির শব্দে আমরা নিচে নামি।। এলাকার লোকজনও আসেন। পুলিশও আসে।’
এ ঘটনায় এখনো থানায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানালেন মোহাম্মদ ইউসুফ।
নাম প্রকাশে আগ্রহী নন এমন এক পুলিশ কর্মকর্তা জানালেন, হুন্ডি ব্যবসা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিরোধের জেরে দেশে এ গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন।
ওসি জাহেদুল ইসলাম চাঁদা দাবি কিংবা অন্য কোনো বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখছেন বলে জানালেন।
গত দুই বছরে চট্টগ্রামে প্রথমে চাঁদা দাবি ও পরে আতঙ্ক তৈরির জন্য বাসা-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে গুলিবর্ষণের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের তদন্তে বিদেশে পলাতক শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর সম্পৃক্ততার তথ্য এসেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর চন্দনপুরায় ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। বড় সাজ্জাদের পরিচয়ে ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির পর গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
এরপর ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) নামে একটি ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বড় সাজ্জাদের ক্যাডার মোবারক হোসেন ইমন প্রকাশ ডেভিড ইমন এককালীন ২ কোটি ও মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৩ জুলাই নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালায় সন্ত্রাসীরা।
একই সন্ত্রাসীচক্র গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বড়দিঘীর পাড় এলাকায় এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও গুলিবর্ষণ করে। জসিম উদ্দিন নামে ওই ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।






