দৃষ্টির বাধা ডিঙিয়েছে তারা ৬ জন

ছবি: আগামীর সময়
ইয়াসমিনের ঘরে আজ খুশির বন্যা। তার দুই ছেলেমেয়ে এসএসসি পাস করেছে। জিপিএ ৫ লাগবে না তার। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই সন্তান পাস করেছে, এতেই তার আনন্দ। অনেক বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে আজ তার দুই সন্তান সাফল্যের মুখ দেখেছে। তাই তো ফল ঘোষণার পর তিনি মিষ্টি নিয়ে ছুটছেন শ্রুতলেখকদের ঘরে।
তার দুই সন্তান হলো মারুফুর রহমান ও রূপসা খানম। নগরের রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তারা এবার এসএসসি পাস করেছে। একই স্কুল থেকে এবার আরও চার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছে। মানবিক বিভাগের এই ছয় শিক্ষার্থী প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় পাস করেই আনন্দিত। খুশি তাদের অভিভাবকরাও।
পাস করা শিক্ষার্থীরা হলো- খাইরুল ইসলাম বাদশা (জিপিএ ২ দশমিক ৩৯), মোহাম্মদ হাবিবুল হক (২ দশমিক ৬৭), লাকি আক্তার (৩ দশমিক ৬১) ও মো. মিনহাজ উদ্দিন (২ দশমিক ৮৩)। দুই ভাইবোন মারুফ জিপিএ ২ দশমিক ৮৯ এবং রূপসা জিপিএ ২ দশমিক ৭৮ পেয়েছে।
মারুফ ও রূপসার মা ইয়াসমিন বললেন, ‘ফলাফলে অনেক খুশি হয়েছি। আমরা গরিব মানুষ। ভালোমন্দ খেতে দিতে পারিনি তাদের। পাসের আনন্দে অনেক কিছু খেতে দিতে মন চায়; কিন্তু পারি না। এখন শ্রুতলেখকদের বাসায় মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছি।’
জানা গেল, মারুফ সাত বছর বয়স থেকে চোখে দেখতে পায় না। হালকা দৃষ্টি থাকলেও তা পড়া কিংবা লেখার জন্য যথেষ্ট নয়। তার বোন রূপসা জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাদের বড় ভাইটির অবশ্য এ সমস্যা নেই। তিনি স্নাতকে পড়ছেন।
মারুফ বলছিল, ‘অনেক কষ্ট করেছি এই পরীক্ষার জন্য। গত বছর আমরা পরীক্ষার্থী ছিলাম; কিন্তু শ্রুতলেখকের অভাবে প্রথম পরীক্ষা দিতে পারিনি। পরের পরীক্ষাগুলো দিলেও ফলাফল ভালো হয়নি। এবার শ্রুতলেখকের সাহায্যে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। খুব ভালো লাগছে।’
এখানেই শেষ নয়, আরও পড়াশোনা করতে চায় মারুফ ও রূপসা। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চায়। তাদের মা ইয়াসমিনও চান সাধ্যমতো পড়াশোনা করাতে। তবে সেখানে রয়েছে অনেক ধরনের বাধা। তাই এসব ডিঙাতে তিনি সহযোগিতা চান প্রতিষ্ঠান ও সচেতন মহলের।
ইয়াসমিন বললেন, ‘মুরাদপুর সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল থেকে একসময় সব শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়। আমরা অথৈ সাগরে পড়ে যাই। পরে রহমানিয়া স্কুলেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। গত বছর কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে বাচ্চারা ঠিকমতো পরীক্ষায় বসতে পারেনি। এ প্লাস দরকার নেই। পাস করেছে, তাতেই খুশি। তাদের আরও পড়াতে চাই।’
রহমানিয়া স্কুল থেকে গতবারও এই ছয় শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু শ্রুতলেখকের অভাবে সেবার পরীক্ষা ঠিকমতো দিতে পারেনি। এবার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের হয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখেছে। পাশে বসে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এসব পরক্ষার্থী। হাটহাজারীর ধলইয়ের হাবিবুল হক রাতুল এসএসসি পাস করে দারুণ খুশি। সে আরও পড়তে চায় বলে জানাল।
অন্যদিকে পাস করেছে তিন বোনের একমাত্র ভাই দৃষ্টিহীন মিনহাজ উদ্দিন। তিন বোন সুস্থ-স্বাভাবিক হলেও মিনহাজ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাই মিনহাজের সাফল্যে পরিবারটিতে খুশির বন্যা বইছে। মিনহাজ বলল, ‘অনেক সংগ্রাম করে আমাদের পড়তে হয়। অনেক বাধা। তাই সবাই খুশি হয়েছে। ভবিষ্যতে আমি শিক্ষক হতে চাই।’
হামজারবাগের খায়রুল ইসলাম বাদশা ২ দশমিক ৩৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। ছয়জনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে হামজারবাগের লাকি আক্তার। সে জিপিএ ৩ দশমিক ৬১ পেয়েছে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে লাকি তৃতীয়। তার বড় বোন মরিয়ম আক্তার সাথীও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তিনি এখন স্নাতকে পড়ছেন।
লাকি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে বলল, ‘আমরা অষ্টম শ্রেণির শ্রুতলেখক নিয়ে যে ফল করেছি, তাতেই খুশি। আমাদের প্রতি পদে বাধা-বিপত্তি ছিল। ছিল অসহযোগিতা। আমার সাফল্যে মা-বাবা সবাই খুশি।’ ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চায় বলেও জানাল সে।




