বাণিজ্যযুদ্ধের বরফ গলল?
৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্কছাড়, শি-ট্রাম্প বৈঠকে ৮ দফা সমঝোতা
- বাণিজ্য থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান থেকে মাদকবিরোধী সহযোগিতা, আমেরিকায় তিন দিনের সফরে নতুন সমীকরণ বেইজিং-ওয়াশিংটনের

ছবি: রয়টার্স
দুই পরাশক্তির সম্পর্ক কখনও শুল্কের দেয়ালে আটকে যায়, কখনও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় জমে ওঠে বরফ। সেই বরফ পুরোপুরি গলেনি, তবে ওয়াশিংটনে শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক তার ওপর নতুন একটি সেতু বসাল। ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে পারস্পরিক শুল্ক কমানো থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সরাসরি আলোচনার পথ খোলা, তিন দিনের সফর শেষে আট দফা সমঝোতায় পৌঁছেছে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে আট দফা সমঝোতার বিস্তারিত জানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে একই দিন প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনেও। শি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর৷ ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি৷
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত বাণিজ্য নিয়ে। দুই দেশ প্রত্যেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘অসংবেদনশীল’ পণ্যে আরও সুবিধাজনক শুল্ক দেওয়ার সুপারিশে একমত হয়েছে। অর্থাৎ ৩০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক মওকুফ নয়, বরং দুই দিকেই ওই পরিমাণ মূল্যের পণ্য আসবে এই ব্যবস্থার আওতায়। মার্কিন কৃষিপণ্য, কাঠ ও প্রসাধনী এবং চীনা ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, খেলনা ও সাজসজ্জার পণ্য এতে থাকতে পারে। দুই দেশ একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিষদও এগিয়ে নেবে।
হোয়াইট হাউস বলেছে, 'দুই দেশ উভয় দিকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের অসংবেদনশীল পণ্যে আরও সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থার সুপারিশে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।' এর আগে নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকা বাণিজ্য যুদ্ধবিরতিও আরও দুই মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।
আট দফার প্রথমটিতে ‘সম্মান, ন্যায্যতা ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে গঠনমূলক ও কৌশলগতভাবে স্থিতিশীল চীন-মার্কিন সম্পর্ক’ গড়ার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় এপেক ও জি২০ সম্মেলন আয়োজনে পরস্পরকে সহায়তা এবং একে অন্যের আয়োজিত সম্মেলনে দুই নেতার যোগ দেওয়ার অভিপ্রায় রয়েছে। তৃতীয় দফায় ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার মানতে বলা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জলপথে কোনও দেশ বা প্রতিষ্ঠান যেন চলাচলের জন্য টোল আরোপ না করে, সে বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই নেতা। চতুর্থ দফায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মিত্রতার ইতিহাস স্মরণ করা হয়েছে।
পঞ্চম দফায় রয়েছে বাণিজ্য পরিষদ, ৩০ বিলিয়ন ডলারের পারস্পরিক শুল্কছাড় কাঠামো এবং কুয়ালালামপুরের আগের বাণিজ্য আলোচনার ফল বহাল রাখা। ষষ্ঠ দফায় মাদক ও রাসায়নিক উপাদান পাচারবিরোধী সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। চীন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানে দুই দেশে কয়েক ডজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।
সপ্তম দফায় সিদ্ধান্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও সুফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু এবং এআই-সংক্রান্ত ঘটনার জন্য যোগাযোগ চ্যানেল গড়ার। পরবর্তী আলোচনা হবে নভেম্বরে। অষ্টম দফায় চীন থেকে আটলান্টার চিড়িয়াখানায় পাঠানো দুই জায়ান্ট পান্ডাকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের সামরিক বাহিনী সংকটকালীন যোগাযোগ জোরদারে একটি সমঝোতা স্মারক করার কথাও জানিয়েছে।
ট্রাম্প বৈঠকটিকে 'বন্ধুত্ব, শক্তি ও সাফল্যের' বৈঠক বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, সফরটি দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে 'নতুন অধ্যায়' খুলেছে। তবে শুল্ক, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি। আট দফার এই সমঝোতা আপাতত দেখাচ্ছে, সংঘাতের পাশাপাশি আলোচনার দরজাটিও খোলা রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন ও বেইজিং।



