জি-২০-তে ট্রাম্পের বড় পরীক্ষা
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ, ইরান যুদ্ধ ও শুল্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ পেরিয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাইলফলক, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির সংকট, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি। সব মিলিয়ে একসঙ্গে একাধিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে ওয়াশিংটন।
এমন পরিস্থিতিতেই নর্থ ক্যারোলাইনার অ্যাশভিলে বসছে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর জি-২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। তার সামনে শুধু মার্কিন অর্থনীতি সামলানোর চ্যালেঞ্জ নয়, মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক কৌশলের পক্ষে আনার কঠিন পরীক্ষাও রয়েছে।
১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঋণ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সুদ পরিশোধের চাপ। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার উঁচু থাকলে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
বেসেন্টের অবস্থান হলো, শুধু সরকারি ব্যয় কমিয়ে নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েই যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণের চাপ সামলাতে হবে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যয়, যুদ্ধের খরচ, করনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপের মধ্যে অর্থনীতি কতটা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের প্রভাব এখন সামরিক ক্ষেত্র ছাড়িয়ে তেল, নৌপরিবহন, বীমা, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হরমুজ প্রণালি নিয়ে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িচালকদের খরচ বাড়বে না। এর প্রভাব পড়বে বিমান ভাড়া, পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজারেও। ফলে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে নিজেদের দেশের মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও সামলাতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন উদ্যোগ। ওয়াশিংটন চাইছে মিত্র দেশগুলো ইরানের তেল, ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দিক। তবে এই কৌশলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে চীনকে ঘিরে।
ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা চীন। তেহরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বাণিজ্য বন্ধ করতে গেলে চীনের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের বড় দ্বন্দ্ব। ইরানকে দুর্বল করতে চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন, অথচ চীনকে চাপ দিতে গেলে ইরান ইস্যুই আবার যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে।
জি-২০ বৈঠকে তাই ইরানের পাশাপাশি চীনের রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং মার্কিন শুল্কনীতিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার শুল্ক। বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানো এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। তবে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও পণ্যের দাম বাড়লে মার্কিন ব্যবসার খরচও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্য দেশগুলো পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে মার্কিন রপ্তানিকারকরাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ফলে বেসেন্টের সামনে কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন, আমেরিকান শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে কীভাবে মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
এরই মধ্যে নজর রয়েছে মার্কিন বন্ডবাজারের ওপরও। সরকারকে পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও নতুন ব্যয় মেটাতে নিয়মিত নতুন বন্ড বিক্রি করতে হয়। বিনিয়োগকারীরা যদি বেশি সুদ দাবি করেন, তাহলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়বে।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুবিধা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, বাণিজ্যিক সংঘাত ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়লে কিছু দেশ বিকল্প মুদ্রা ও লেনদেনব্যবস্থার দিকে আরও ঝুঁকতে পারে। এখনই ডলারের আধিপত্য শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনৈতিক নীতির ওপর আস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশেও পৌঁছাতে পারে। হরমুজে তেল সরবরাহ দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সুদের হার ও ডলারের মূল্যের পরিবর্তন বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই অ্যাশভিলের জি-২০ বৈঠক শুধু অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের নিয়মিত বৈঠক নয়। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক কৌশলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারও বড় পরীক্ষা।
স্কট বেসেন্টকে একই সময়ে সামলাতে হবে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ, ইরান যুদ্ধের ব্যয়, হরমুজের জ্বালানি ঝুঁকি, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাত এবং শুল্কনীতির চাপ। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এসব সংকট আলাদা নয়। ইরান যুদ্ধ থেকে হরমুজ, সেখান থেকে তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং শেষ পর্যন্ত ঋণের চাপ, সবকিছু একই অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বরের জি-২০ বৈঠক তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় এক পরীক্ষা। ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ, যুদ্ধ, শুল্ক ও চীনের সঙ্গে সংঘাত একসঙ্গে সামলে ট্রাম্প কি আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারবেন, নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির খরচ শেষ পর্যন্ত দিতে হবে আমেরিকান জনগণকেই?








