ইরান সামলাতে গিয়ে এশিয়ায় মার্কিন শক্তি সরতেই নজর চীনের

ইরানকে চাপে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেই কৌশলের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে মনোযোগ দিতে গিয়ে কি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল করে ফেলছে ওয়াশিংটন? আর সেই সুযোগ কি কাজে লাগাতে চাইছে চীন?
চলতি বছরের আগস্টে ইরান পরিস্থিতি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বাড়ার পর একাধিক পদক্ষেপ এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় মোতায়েন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হল, জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানিয়েছে, জর্জ ওয়াশিংটনের এই মোতায়েন একটি পরিকল্পিত সামরিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। তবে এর ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাময়িক ভাবে কোনও মার্কিন বিমানবাহী রণতরী না থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের নিরাপত্তা কৌশলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।
জাপান থেকে সরল ‘জর্জ ওয়াশিংটন’
ইরান সংকট ঘিরে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি বাড়ার সময় কিছুদিন আগেই জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটি থেকে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন'কে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে জাপানের ইয়োকোসুকাকে নিজের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিল। এটি ছিল পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী উপস্থিতি। এর আগে একই ঘাঁটিতে থাকা ইউএসএস রোনাল্ড রিগ্যানের জায়গা নিয়েছিল এই রণতরী।
ইরান পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার পর ওয়াশিংটন নৌবহরের চাপ কমাতে জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এটি আরব সাগর অঞ্চলে পৌঁছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মার্কিন সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিমানবাহী রণতরী সরিয়ে নেওয়া সামরিক দিক থেকে স্থায়ী দুর্বলতা তৈরি করে না, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবহর রয়েছে। কিন্তু কৌশলগত বার্তার দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে এমন সময়েই প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন উপস্থিতির প্রতীকী শক্তি কমেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন
শুধু জাপান নয়, দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার কিছু উপাদান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ইরান পরিস্থিতি ঘিরে মার্কিন সামরিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের স্থান পরিবর্তনের খবর সামনে আসে।
তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা পরে স্পষ্ট করেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা পুরো থাড ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, কিছু রাডার উপাদান ও গোলাবারুদের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছিল, কিন্তু মূল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোরীয় উপদ্বীপেই রয়েছে।
তবু সিউলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি এখনও উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মধ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদের যে কোনও পুনর্বিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
চীনের জন্য নতুন সুযোগ?
যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান নিয়ে ব্যস্ত, তখন চীন সরাসরি কোনও সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
প্রথমত, ইরানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা হিসেবে রয়েছে চীন। ফলে ওয়াশিংটনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি তেহরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করার চেষ্টা করলেও বেজিংয়ের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক টিকে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, চীন নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। বেজিংয়ের বক্তব্য, ইরান সংকটের সমাধান সামরিক চাপ দিয়ে নয়, আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, এশিয়ায় মার্কিন মনোযোগ বিভক্ত হওয়াকে চীন কৌশলগত ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরে বেজিংয়ের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলির উদ্বেগ রয়েছে।
তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বাড়ছে নজর
এশিয়ার সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন এখন তাইওয়ান। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক সম্প্রসারণ ঠেকানো তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক মনোযোগ কতটা ভাগ হয়ে যাবে, তা নিয়ে মিত্র দেশগুলির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যদিও চীন এখনই বড় কোনও সামরিক পদক্ষেপ নেবে এমন কোনও প্রমাণ নেই। বরং বেজিং সম্ভবত পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সুবিধা তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখছে।
ট্রাম্পের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হল, একদিকে ইরানকে চাপে রাখা, অন্যদিকে এশিয়ায় চীনের মোকাবিলায় মিত্রদের আস্থা ধরে রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্ররা প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট থাকার কথা বললেও, সামরিক সম্পদ সরানোর সিদ্ধান্ত তাদের মধ্যে নতুন হিসাব তৈরি করেছে। ফিলিপাইন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক পুনর্বিন্যাস তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে না। তবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগ রয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ আধুনিক ভূরাজনীতিতে একটি অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
তেহরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে ওয়াশিংটন যদি এশিয়ার মঞ্চে সাময়িক ফাঁক তৈরি করে, তবে সেই ফাঁক পূরণে সবচেয়ে সক্রিয় খেলোয়াড় হতে পারে চীন। আর সেই কারণেই ইরান সংকট এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়, এটি এশিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তির লড়াইয়েরও অংশ।






