ব্যস্ত সপ্তাহে ধরা পড়ল ট্রাম্পের কূটনৈতিক দুর্বলতা!

হোয়াইট হাইজের ব্যালকনিতে সস্ত্রীক ট্রাম্প এবং শি। ছবি: রয়টার্স
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে জোরালো বক্তব্য। এরপর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউজে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা। চলতি সপ্তাহে বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব আবারও দেখাতে চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু কতটা সফল হলেন? সপ্তাহ জুড়ে তার কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে শেষ পর্যন্ত তার বেশকিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরান যুদ্ধ এখনো থামেনি। এতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দূরত্বও বাড়ছে।
চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির বেশকিছু উদ্যোগ অচলাবস্থায় আটকে আছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।
জাতিসংঘে মঙ্গলবারের ভাষণে ট্রাম্প অবশ্য ভিন্ন সুর দেখিয়েছেন। তিনি ইরানকে চুক্তিতে রাজি না হলে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানও সমর্থন করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কিন্তু শির সঙ্গে বৈঠকে সেই কঠোর অবস্থানের অনেকটাই দেখা যায়নি। তিন দিনের সফরে জাঁকজমকপূর্ণ থাকলেও বড় কোনো সমঝোতা হয়নি। সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যচুক্তির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো।
তাইওয়ান নিয়েও মতপার্থক্য রয়ে গেছে। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বেইজিংয়ের কাছে তাইওয়ান সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি চীন-সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি।
বাণিজ্যযুদ্ধেও ট্রাম্পের অবস্থান আগের মতো কঠোর নেই। চীনের বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং এসব সরবরাহ সীমিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনকে হিসাব করে এগোতে হচ্ছে।
ইরানেই বড় অচলাবস্থা
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতির জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর প্রায় সাত মাস ধরে সংঘাত চলছে। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়েছে। ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের নৌপথও এর প্রভাবে পড়েছে।
এর আগে গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ভেনেজুয়েলার নেতাকে আটক করার মতো ঘটনাকে ট্রাম্প তার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এখন সেই সাফল্যের ওপর ছায়া ফেলছে।
যুদ্ধটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তির মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি তার জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
মিত্রদেরও অনীহা
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পাননি। অনেক মিত্রই তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘেও কয়েকজন নেতা ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ট্রাম্পের ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও তার দেশের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
তিনি বলেছেন, অপরাধ ঠেকাতে তার দেশের জলসীমায় বিমানবাহী রণতরি নয়, সহযোগিতা প্রয়োজন।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বলেছে, প্রেসিডেন্ট লোক দেখানো অবস্থান নয়, ফলাফল চান। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা আরও বলেছেন, প্রকাশ্যে নেতাদের বক্তব্য আর ব্যক্তিগত আলোচনার বক্তব্য এক নয়।
ইউক্রেন এবং গ্রিনল্যান্ডেও সীমাবদ্ধতা
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে অন্তত জ্বালানি অবকাঠামোয় সীমিত যুদ্ধবিরতি আনার ট্রাম্পের উদ্যোগও খুব বেশি এগোয়নি।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে সমঝোতাও হয়েছে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেওয়ার ট্রাম্পের আগের দাবি সেখানে বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও তিনি দিয়েছিলেন।
ফলে ট্রাম্পের কূটনীতিতে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে। তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও প্রভাবের কথা জোর দিয়ে বলছেন।
অন্যদিকে চীন, ইরান, রাশিয়া, ইউরোপ ও কানাডার মতো দেশ বা পক্ষগুলো তার সব দাবিতে সাড়া দিচ্ছে না।
কূটনীতি বিশ্লেষক ইয়ান ব্রেমার লিখেছেন, এক বছর আগে অনেক দেশ ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে ভয় পেত। এখন অনেকেই তাকে ‘না’ বলার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।
এই বাস্তবতা সম্ভবত ট্রাম্প নিজেও বুঝতে পারছেন। জাতিসংঘে এআইকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলার সময় তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘দেখি আমার কোনো ক্ষমতা আছে কি না।’ এরপর নিজেই বলেছেন, ‘হয়তো আছে, হয়তো নেই। শিগগিরই তা জানা যাবে।’
ট্রাম্পের এ মন্তব্যই চলতি সপ্তাহের কূটনীতির একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন। কিন্তু তার ইচ্ছা আর বিশ্ববাস্তবতার মধ্যে দূরত্বও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্র : রয়টার্স





