৭০ বছরের বি-৫২ বোমারু বিমানকে আধুনিক করতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
- রাডার ও নতুন ইঞ্জিন বসানোর কাজে দেরি
- খরচও বাড়ছে
- পেন্টাগনের পুরনো ‘আকাশযোদ্ধা’-কে টিকিয়ে রাখতে নতুন পরীক্ষা

সংগৃহীত ছবি
শীতল যুদ্ধের সময়ের সেই ভয়ঙ্কর বোমারু বিমান এখনো আমেরিকার কৌশলগত শক্তির অন্যতম প্রতীক। কিন্তু বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস-কে আধুনিক যুগের উপযোগী করে তোলার প্রকল্পেই দেখা দিয়েছে একের পর এক বাধা।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নজরদারি সংস্থা গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পগুলোয় বিলম্ব বাড়ছে। এর মধ্যে বি-৫২ আধুনিকীকরণ কর্মসূচিও রয়েছে, যেখানে সময়সূচি পিছিয়েছে এবং ব্যয় বেড়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই বিমানকে শুধু পুরনো যুদ্ধবিমান হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং আগামী কয়েক দশকেও যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার কৌশলগত হামলা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে রাখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বি-৫২ বহরকে ২০৫০-এর দশক পর্যন্ত সক্রিয় রাখার লক্ষ্য নিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী।
কোথায় আটকে গেল আধুনিকীকরণ?
বি-৫২ আধুনিকীকরণ প্রকল্পের মূল দুটি অংশ: নতুন রাডার ব্যবস্থা স্থাপন এবং পুরনো ইঞ্জিন বদলে নতুন জ্বালানি সাশ্রয়ী ইঞ্জিন বসানো৷ কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রেই বিলম্ব তৈরি হয়েছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরনো যান্ত্রিক রাডারের জায়গায় নতুন অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার বসানো হবে, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও আক্রমণ সক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি নতুন ইঞ্জিন বিমানটির উড়ান ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াবে।
তবে সরকারি নজরদারি সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, নকশাগত পরিবর্তন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে খরচও বেড়েছে।
খরচ ও সময়সূচি স্থিতিশীল হয়েছে : বিমানবাহিনীর দাবি
বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও মার্কিন বিমানবাহিনী জানিয়েছে, প্রকল্প এখন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে বিমানবাহিনীর অধিগ্রহণ বিভাগের কর্মকর্তা উইলিয়াম বেইলি বি-৫২ আধুনিকীকরণ নিয়ে বলেছেন, প্রকল্পের ‘খরচ ও সময়সূচি স্থিতিশীল করা হয়েছে’। তিনি জানান, সরকার ও শিল্প সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে কংগ্রেস সদস্যদের উদ্বেগ, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে যদি বারবার দেরি হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রস্তুতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।
১৯৫০-এর দশকের বিমান, এখনো কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রথম বি-৫২ বিমান আকাশে উঠেছিল ১৯৫২ সালে। কয়েক দশক ধরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার বোমা হামলা সক্ষমতার প্রতীক।
যদিও বর্তমানে স্টেলথ প্রযুক্তির নতুন প্রজন্মের বিমান যেমন বি-২১ রেইডার তৈরি হচ্ছে, তবুও বি-৫২-কে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ এটি দীর্ঘ দূরত্বে উড়তে পারে, বিপুল অস্ত্র বহন করতে পারে এবং নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করে এর ব্যবহার আরও কয়েক দশক চালানো সম্ভব বলে মনে করছে পেন্টাগন।
বয়সী অস্ত্র, নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বি-৫২ প্রকল্প শুধু একটি বিমান আধুনিকীকরণের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্প ব্যবস্থার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক প্রকল্পে সময় ও খরচ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস জানিয়েছে, বিমানবাহিনীর বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে কর্মী সংকট, যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং দীর্ঘ মেরামত সময় সমস্যা তৈরি করছে।
সাত দশক পেরিয়ে যাওয়া বি-৫২ এখনো আকাশে ভয় জাগায়। কিন্তু তাকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে গিয়ে আমেরিকাকে এখন লড়তে হচ্ছে আরেক যুদ্ধের সঙ্গে: সময়, প্রযুক্তি এবং ব্যয়ের যুদ্ধ।





