যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের মহড়া ডেকে আনতে পারে যুদ্ধ

সংগৃহীত ছবি
চলতি মাসের শুরুর দিকে ফিলিপাইনের ইলোকোস নর্তে প্রদেশের একটি মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় দেশটির ইনডিপেনডেন্ট চার্চের ফাদার আরভিন মাংরুবং দেখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের বহনকারী ডজনখানেক সাঁজোয়া যান ও ট্রাক তার বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে আসছে। ওই দৃশ্য দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, এখানে সামরিক বাহিনী আর যুদ্ধের এই হুমকি এখন খুবই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ফিলিপাইনের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই উপকূলীয় প্রদেশটির একদিকে দক্ষিণ চীন সাগর, আর মাত্র ৩৪৫ কিলোমিটার উত্তরেই তাইওয়ানের অবস্থান। এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে প্রদেশটিতে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের যৌথ সামরিক শক্তির বড় বড় প্রদর্শনী হয়। সম্প্রতি এখানে শেষ হয় দুই দেশের বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘বালিকাতান’।
ফাদার মাংরুবং জানালেন, বছরের অন্য সময়েও এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের দেখা যায়। তবে এপ্রিল ও মে মাসের গ্রীষ্মকালীন সময়ে তাদের সামরিক তৎপরতা চরমে পৌঁছায়। তখন সাধারণ মানুষের মনে হয়, যেকোনো মুহূর্তে বুঝি বড় কোনো সংঘাত শুরু হতে যাচ্ছে!
‘ট্যাংক, ড্রোন আর গুলির তীব্র আওয়াজ সবাইকে আতঙ্কের মধ্যে রাখে। বিশেষ করে যারা মহড়াস্থলের খুব কাছে বসবাস করেন’, যোগ করেন মাংরুবং।
এবারের তিন সপ্তাহব্যাপী বালিকাতান মহড়াটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। এতে ফিলিপাইনের পাশাপাশি আরও ছয়টি দেশের ১৭ হাজারের বেশি সেনা অংশ নেয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল মার্কিন সেনা। যার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এ ছাড়া কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও নিউজিল্যান্ডের কয়েক হাজার সেনা এতে যোগ দেয়।
ফিলিপাইনের অধিকারকামী সংগঠনগুলোর জোট বায়ানের সাধারণ সম্পাদক রেমন্ড পালাতিনো জানালেন, ফিলিপাইনের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা থেকে নিজেদের দূরে রাখা। একইসঙ্গে যৌথ মহড়া বন্ধ করা।
আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, এই তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষেত্রকে পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) থেকে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করার পথ তৈরি করে দিচ্ছে।
তবে ফিলিপাইনের মেজর জেনারেল ফ্রান্সিসকো লরেঞ্জো জুনিয়র দাবি করেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে এই মহড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই মহড়া চীন বা অন্য কোনো দেশের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ নয়।
তবে ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র মার্কো ভালবুয়েনা এই দাবিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই মহড়া ফিলিপাইনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করবে। একই সঙ্গে এশিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালানোর পথকে সহজ করবে।
ম্যানিলার ডি লা স্যাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক স্টাডিজের অধ্যাপক রেনাতো দে কাস্ত্রো আলজাজিরাকে বলেছেন, এবারের বালিকাতান মহড়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ও চীনকে দেখাতে চায়, তারা একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এই দুই ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন ও যুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষম।
এই মহড়া চলাকালে দক্ষিণ চীন সাগরের আঞ্চলিক দাবি নিয়ে বেইজিং ও ম্যানিলার মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক আদালত ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দিলেও চীন এই সাগরের ৯০ শতাংশ নিজেদের দাবি করে এবং প্রায়ই ফিলিপাইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়।
বালিকাতান মহড়া শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে গত ২৪ এপ্রিল চীনের সাউদার্ন থিয়েটার কমান্ড ফিলিপাইনের লুজন দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগরে লাইভ-ফায়ার মহড়া চালায়। চীনা সামরিক বাহিনী জানায়, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থেই এই মহড়া।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘বহিরাগত শক্তির প্রবেশের ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত শুরু হোক, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা নিজেদের নিরাপত্তা অন্যের হাতে তুলে দেয়, তাদের মনে রাখা উচিত, এটি উল্টো নিজেদের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।’






