নিউ ইয়র্ক পুলিশে বাংলাদেশিদের উত্থান
- নীল পোশাকে এক হাজারের বেশি বাঙালি
- নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরেও বাড়ছে উপস্থিতি

ছবি : বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)
নিউ ইয়র্ক পুলিশের নীল পোশাকে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি এখন ছাড়িয়েছে এক হাজার। সংখ্যার পাশাপাশি বাড়ছে দায়িত্বের পরিধিও। ডিটেকটিভ, সার্জেন্ট, লেফটেন্যান্ট, ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে এবার ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদেও জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশি-আমেরিকানরা। সর্বশেষ এক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে ১০ বাংলাদেশি সদস্য পদোন্নতি পেয়ে নিয়েছেন নতুন দায়িত্ব।
২৮ সেপ্টেম্বর ওয়ান পুলিশ প্লাজায় আয়োজিত বিশেষ প্রমোশন অনুষ্ঠানে নিউ ইয়র্ক পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশের নেতৃত্বে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় কর্মকর্তাদের। ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) ১০ সদস্যও পান নতুন পদ ও দায়িত্ব।
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশিদের পেশাগত অগ্রযাত্রার নতুন চিত্র এখন শুধু ব্যবসা, প্রযুক্তি কিংবা চিকিৎসা পেশায় নয়। পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশাতেও বাড়ছে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ। একসময় যে বাহিনীতে বাংলাদেশি মুখ ছিল হাতে গোনা, সেখানে এখন হাজারের বেশি বাংলাদেশি-আমেরিকান ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করছেন— এমন প্রকাশ্য হিসাব সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের শহরে দায়িত্বে বাংলাদেশিরাও
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে সেপ্টেম্বর জুড়ে নিউ ইয়র্কে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।
এই বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ ছিলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ সদস্যরাও। নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও কূটনৈতিক কর্মসূচি ঘিরেও দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ব্যস্ত নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন কমিউনিটির জন্যও আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।
নীল পোশাকে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি
সর্বশেষ প্রকাশ্য বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এনওয়াইপিডির প্রায় ৩৩ হাজার ইউনিফর্মধারী সদস্যের মধ্যে কাজ করছেন এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি-আমেরিকান। একই সঙ্গে পুলিশ বিভাগের বেসামরিক কর্মীদের মধ্যেও প্রায় ১ হাজার ৫০০ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মী রয়েছেন।
তবে এই সংখ্যা এনওয়াইপিডির নিজস্ব প্রকাশিত বাংলাদেশি হেডকাউন্ট নয়। বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনের দেওয়া হিসাব থেকে এই সংখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে হালনাগাদ এনওয়াইপিডির সরকারি ব্যক্তিগত জনসংখ্যাবিষয়ক
ডেটাবেজে বিভাগের সদস্যদের লিঙ্গ, গোত্র, পদবি এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সদস্যদের আলাদা মোট সংখ্যা সেখানে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ২০২৬ সালের বাংলাদেশি সদস্যের সুনির্দিষ্ট সরকারি সংখ্যা প্রকাশ্য ডেটা থেকে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
তবে প্রকাশ্য হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ১০ জন ডিটেকটিভ, ৮২ জন সার্জেন্ট, ২০ জন লেফটেন্যান্ট এবং ৪ জন ইন্সপেক্টর। শুধু এই চারটি পদেই দায়িত্ব পালন করছেন ১১৬ জন বাংলাদেশি-আমেরিকান কর্মকর্তা।
অর্থাৎ বাংলাদেশিদের উপস্থিতি শুধু সংখ্যায় নয়, ধীরে ধীরে কমান্ড কাঠামোর ওপরের দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে।
‘এটা আমাদের বাঙালিদের জন্য গৌরবের’
এনওয়াইপিডির বাংলাদেশি-আমেরিকান সার্জেন্ট মোহাম্মদ হালিম মনে করেন, পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ পুরো বাঙালি কমিউনিটির জন্য গৌরবের বিষয়।
তিনি বলেছেন, 'এটা আমাদের বাঙালিদের জন্য গৌরবের জায়গা। ডে বাই ডে আমাদের বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে থেকে আরও মানুষ এনওয়াইপিডিতে সংযুক্ত হচ্ছে।'
হালিম বলেন, বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের অবস্থান এখন আর শুধু পুলিশ অফিসার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। অভিজ্ঞতার সঙ্গে পদোন্নতি পেয়ে অনেকে বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাচ্ছেন।
তার ভাষায়, 'সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাত্র তিন ধাপ নিচেই এখন আমাদের একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। সেই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন পুলিশ কমিশনারও একজন বাংলাদেশি হবেন।'
তার এই বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশার কথাও। কারণ এনওয়াইপিডিতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই নতুন প্রজন্মের সামনে তৈরি হচ্ছে পুলিশের চাকরিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার নতুন উদাহরণ।
এক অনুষ্ঠানে ১০ বাংলাদেশির পদোন্নতি
২৮ সেপ্টেম্বরের পদোন্নতি অনুষ্ঠানে ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত হয়েছেন মোহাম্মদ ইসলাম।
লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পেয়েছেন হুমায়ুন কবির, মোহাম্মদ চৌধুরী ও মো. করিম।
সার্জেন্ট হয়েছেন মোহাম্মদ শারবেল ও মোহাম্মদ চৌধুরী।
ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট বিভাগেও এসেছে বাংলাদেশিদের পদোন্নতি। মোহাম্মদ রহমান পেয়েছেন শিক্ষানবিশ সহযোগী ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট (লেভেল ২) বা ট্রাফিক কমান্ডার পদ। আরেক মোহাম্মদ রহমান পেয়েছেন শিক্ষানবিশ সহযোগী ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট পর্যায় বা টিএসওয়ান পদ। একই পদে উন্নীত হয়েছেন জেহেদি রহমান।
এ ছাড়া আকরাম হোসেন পদোন্নতি পেয়েছেন ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট লেভেল ৩ পদে।
একই অনুষ্ঠানে ১০ বাংলাদেশির পদোন্নতি এনওয়াইপিডির ভেতরে বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রার একটি বড় প্রতীক হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ডেপুটি ইন্সপেক্টর এবং লেফটেন্যান্টের মতো দায়িত্বে বাংলাদেশিদের পদোন্নতি কমিউনিটির মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে।
পথ দেখাচ্ছে এক প্রজন্ম, এগিয়ে আসছে আরেক প্রজন্ম
নিউ ইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশি সদস্যদের এই অগ্রযাত্রা এক দিনে তৈরি হয়নি। অভিবাসনের শুরুতে নতুন দেশে টিকে থাকার সংগ্রাম পেরিয়ে ধীরে ধীরে বাংলাদেশিরা বিভিন্ন পেশায় নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। পুলিশের চাকরিতেও সেই পরিবর্তন এখন স্পষ্ট।
অনেকে সিভিলিয়ান পদ থেকে শুরু করেছেন। পরে নাগরিকত্ব অর্জনের পর পুলিশ একাডেমিতে যোগ দিয়েছেন। কেউ সরাসরি পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা ও পদোন্নতির ধাপ পেরিয়ে অনেকে এখন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছেছেন।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। আগে যেখানে একজন বাংলাদেশির পুলিশে যোগ দেওয়া ছিল আলাদা করে আলোচনার বিষয়, এখন সেখানে একই অনুষ্ঠানে ১০ বাংলাদেশির পদোন্নতির খবর সামনে আসছে।
আর এই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।
শুধু সংখ্যা নয়, পরিচয়েরও পরিবর্তন
নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় তাদের প্রতিনিধিত্বও বাড়ছে। তবে পুলিশের মতো দায়িত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশায় বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আলাদা করে নজর কাড়ছে।
এক হাজারের বেশি ইউনিফর্মধারী বাংলাদেশি-আমেরিকানের প্রকাশ্য হিসাব, বিভিন্ন পর্যায়ে শতাধিক কর্মকর্তা এবং সর্বশেষ এক অনুষ্ঠানে ১০ জনের পদোন্নতি— সব মিলিয়ে এনওয়াইপিডিতে বাংলাদেশিদের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান।
এটি শুধু চাকরির সংখ্যা বাড়ার গল্প নয়। এটি অভিবাসী বাংলাদেশিদের নতুন পরিচয় তৈরির গল্পও।
নিউ ইয়র্ক পুলিশের নীল পোশাকে আজ যে বাংলাদেশি তরুণ দায়িত্ব পালন করছেন, আগামী দিনে তার পদোন্নতির লক্ষ্য হয়তো আরও ওপরে। আর সেই পথের শেষ সীমানা কোথায়— তার উত্তর ভবিষ্যৎই দেবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— নিউ ইয়র্ক পুলিশের নীল পোশাকে বাংলাদেশিদের উত্থান এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক পরিবর্তন, যেখানে সংখ্যা বাড়ছে, পদ বাড়ছে, দায়িত্ব বাড়ছে আর সঙ্গে বাড়ছে নেতৃত্বের স্বপ্নও।



