ট্রাম্পের বিজ্ঞাননীতির বিরুদ্ধে ব্যালটে পাল্টা জবাব
আমেরিকার নির্বাচনে কেন বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের জয়জয়কার?
- গবেষণায় অর্থছাঁটাই, টিকা নিয়ে বিতর্ক আর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অস্থিরতার মধ্যেই চিকিৎসক-বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক সাফল্য
- চাপে কেনেডির স্বাস্থ্য আন্দোলন, নতুন ইতিহাস আমেরিকার নির্বাচনে

সংগৃহীত ছবি
হাসপাতালে মানুষের জীবন বাঁচানোই ছিল তাদের পেশা। গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কার ছিল সাধনা। কিন্তু সেই চিকিৎসক-বিজ্ঞানীদেরই এবার নামতে হলো আমেরিকার রাজনীতির ময়দানে। কারণ, গবেষণায় অর্থছাঁটাই। টিকা নিয়ে বিতর্ক। চিকিৎসার খরচে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্যনীতি ঘিরে জমছিল অসন্তোষ। আর সেই অসন্তোষের মধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাজিমাত করলেন একঝাঁক চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। তাদের সমর্থকেরা বলেছেন, এ যেন ‘মেধাবীদের প্রত্যাঘাত’। কিন্তু কেন এই উত্থান? বিজ্ঞানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নাকি চিকিৎসার অসহনীয় ব্যয় থেকে মুক্তির আশা? আমেরিকার ভোটের ফল সামনে আনছে দুই প্রশ্নই।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের অধীনে জনস্বাস্থ্য ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দীর্ঘ অস্থিরতার পর। কেনেডির ‘আমেরিকাকে আবার সুস্থ করে তুলি’ আন্দোলনও প্রশ্নের মুখে। বিজ্ঞানমনস্ক প্রার্থীদের সমর্থনকারী সংগঠন ‘৩.১৪ অ্যাকশন’-এর নির্বাহী পরিচালক এরিক পোলিয়াক বলেছেন, ‘২০২৬ ছিল স্বাস্থ্যসেবার নির্বাচন।’ তার মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ চিকিৎসার খরচ।
মিশিগানে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ আবদুল এল-সায়েদ এবং সাউথ ক্যারোলাইনায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজ জয় পেয়েছেন সিনেট আসনে। গার্ডিয়ানের হিসাবে, ১৯৬৯ সালের পর এই প্রথম মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হলেন ডেমোক্র্যাট চিকিৎসকেরা। ওহাইয়োর গভর্নর হয়েছেন চিকিৎসক অ্যামি অ্যাকটন। ক্যালিফোর্নিয়ায় জয় পেয়েছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ রিচার্ড প্যান।
অথচ আগে কংগ্রেসের চিকিৎসক সদস্যদের বড় অংশই ছিলেন রিপাবলিকান। এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তাদের ৮৬ শতাংশ ছিলেন ওই দলের। এবার পরাজিতদের মধ্যে রয়েছেন কেনেডির ঘনিষ্ঠ চিকিৎসক মারিয়ানেট মিলার-মিকস ও রজার মার্শাল।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সংকট। গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের কর্মীসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমেছে। জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই নির্বাচনের দিন নিউইয়র্কে তিন দশকের মধ্যে প্রথম শিশুর হামজনিত মৃত্যুর খবর আসে।
নির্বাচনী প্রচারেও স্বাস্থ্যসেবাই হয়ে ওঠে বড় অস্ত্র। ডেমোক্র্যাটরা এ বিষয়ে এক লাখ ৫৮ হাজারের বেশি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। রিপাবলিকানরা প্রায় ৬১ হাজার। শুধু ‘৩.১৪ অ্যাকশন’ ব্যয় করেছে দুই কোটি ৩০ লাখ ডলার। এল-সায়েদ সবার জন্য চিকিৎসাবিমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অ্যান্ড্রুজ হামের বিস্তারের সময় সরাসরি স্বাস্থ্যপরামর্শ দিয়েছেন।
রবার্ট উড জনসন ফাউন্ডেশনের প্রধান রিচার্ড বেসারের মতে, অতিরিক্ত চিকিৎসাব্যয় আর জটিল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মানুষ ক্লান্ত। তারা চান এমন জনপ্রতিনিধি, যারা বাস্তব সমস্যার সমাধান করবেন। আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট ক্রিস্টিনা বোহানান ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ওহাইয়োয় মহামারিকালে জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা অ্যামি অ্যাকটনের পক্ষে গেছে।
তবে নির্বাচনী জয় মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। আগামী বছর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া চিকিৎসাসহায়তায় কাটছাঁটের ফলে পরবর্তী দশকে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ বিমা হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা। সামনে রয়েছে শক্তিশালী ওষুধ ও বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবও।যারা এত দিন রোগীর জীবন বাঁচাতে লড়েছেন, এবার তাদের লড়াই মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার রক্ষার। কিন্তু ভোটের বাক্সে বিজ্ঞানীদের এই উত্থান কি সত্যিই বদলে দেবে ওয়াশিংটনের স্বাস্থ্যনীতি? নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার পুরনো হিসাবেই আটকে যাবে তাঁদের প্রতিশ্রুতি? আমেরিকার এবারের নির্বাচন অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্তে শেষ কথা বলবে রাজনীতি, নাকি বিজ্ঞানের প্রমাণ?



