কেমন ব্রিটেন রেখে যাচ্ছেন স্টারমার

পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন স্টারমার
চূড়ান্ত পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। এ নিয়ে গত ১০ বছরের মধ্যে সাতবারের মতো পরিবর্তন হতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী। ২০১৬ সালের এক গণভোটে রায় আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে ব্রিটেন। যা ইতিহাসে ব্রেক্সিট নামেই পরিচিত। তবে গণভোটের প্রায় তিন বছর পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি কার্যকর হয় ব্রেক্সিট। সেই থেকে দেশটির রাজনৈতিক সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। কেমন ব্রিটেন পেয়েছিলেন স্টারমার আর কেমনই বা রেখে যাচ্ছেন।
২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং একে একে চারজন প্রধানমন্ত্রীর (থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাক) নাটকীয় বিদায়ের পটভূমিতে কিয়ার স্টারমার ক্ষমতায় আসেন। ‘ভোট লিভ’ প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের ইইউ ত্যাগ, অভিবাসন হ্রাস ও অর্থনৈতিক উন্নতির যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ না নিয়ে উল্টো বছরের পর বছর রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা ডেকে আনে।
বরিস জনসনের নীতিগত ব্যর্থতা ও পার্টিগেট কেলেঙ্কারি, লিজ ট্রাসের মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মিনি বাজেট এবং সর্বশেষ ঋষি সুনাকের আমলে তীব্র হওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট— সব মিলিয়ে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের প্রতি ব্রিটিশ জনগণের চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর ভোটারদের এই তীব্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং ঐতিহ্যগত ব্যবস্থার প্রতি পুঞ্জীভূত গণ-অসন্তোষকে পুঁজি করেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে এক বিশাল জয় এনে দিয়ে কিয়ার স্টারমার ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
স্টারমারের সময়কাল যেকোনো লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম মেয়াদ হিসেবে গণ্য হবে। তার অবদান ঠিক কতখানি তা এখন পর্যালোচনার সময় এসেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, ইতিহাস বিচার করার জন্য তিনি খুব সামান্যই অবদান রেখে যাচ্ছেন। এমনকি প্রায় তিন বছর টিকে থাকা গর্ডন ব্রাউনও দাবি করতে পারেন তিনি বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ে বিশ্বকে বাঁচিয়েছিলেন। পাশাপাশি লেবার পার্টির নতুন সংস্কারের মাধ্যমে এনএইচএস ও স্কুলগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছিলেন।
সমালোচকদের মতে, এ পর্যন্ত স্টারমারের দুটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো করবিনপন্থীদের হাত থেকে লেবার পার্টিকে উদ্ধার করা এবং সাধারণ নির্বাচনে বড় জয় ছিনিয়ে আনা। তবে ইরান যুদ্ধে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়ানো নিঃসন্দেহে অন্যতম সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল; কিন্তু সেই নির্বাচনের স্মৃতি যখন ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করল, তখন এই প্রশ্নটি আরও বেশি জোরালো হয়ে উঠল। আসলে এই জয়ের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? আর দিন দিন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ছিল।
ক্ষমতায় থাকাকালে তার প্রধান পদক্ষেপগুলো ছিল মূলত কর বৃদ্ধি করা। যার বড় অংশই কনজারভেটিভদের রেখে যাওয়া বিপর্যস্ত জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য করা হয়েছিল। তবে এর পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণমূলক ভাতার পেছনে বাড়তি ব্যয় মেটাতেও এটি করা হয়। স্টারমার আসলে কনজারভেটিভদের পরিকল্পনার চেয়ে বেশি অর্থ কল্যাণ খাতে ব্যয় করতে চাননি; কিন্তু তার নিজের সংসদীয় দলের চাপের মুখে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরাজয়ের কারণে তিনি তা করতে বাধ্য হন। এটি তাকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেয়। তার সরকার এমন ছিল, যারা ক্ষমতায় বসার পর ঠিক কী করবে— সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্টারমার বেশ সক্রিয় ছিলেন। ইউক্রেনের জনগণের সমর্থনে ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ইউক্রেনকে পুরোপুরি পরিত্যাগ না করেন, সে বিষয়ে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সামলেছিলেন। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্কের হাত থেকে রক্ষা পায় ব্রিটেন। নামমাত্র বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করতেও সক্ষম হন তিনি। যার বেশিরভাগই অবশ্য কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে ট্রাম্পের পাগলামি সামলানোর ক্ষেত্রে স্টারমারের এই সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয়। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্রিটিশ নৌ ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার পর। অল্প সময়ের মধ্যে কঠিন পরিস্থিতিতে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণেই চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন স্টারমার। সমালোচকদের মতে তার সিদ্ধান্ত ভুল। তবে কিছু ক্ষেত্রে তিনিই সঠিক ছিলেন।
২০১৫ সালে লন্ডনের লেবার আসন ‘হলবোর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস’ থেকে এমপি হওয়ার মাধ্যমে স্টারমারের সংসদীয় রাজনীতির সূচনা। হাউজ অব কমন্সে প্রবেশ করার আগেই তাকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তি মনে করা হতো। একটি রহস্যময় টুইটার অ্যাকাউন্ট একদম নতুন এমপি স্টারমারকে লেবার পার্টির নেতা করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তিনি সাবেক পাবলিক প্রসিকিউশন প্রধান হিসেবে তৈরি করা জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন। জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের সময়ে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি বেশ দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। দলটির ভেতরে জেঁকে বসা ইহুদি-বিদ্বেষের মনোভাব থেকে নিজেকে ঠিক যতটুকু দূরত্বে রাখা দরকার তা বজায় রেখে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে তিনি লেবার সদস্যদের প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। ২০১৯ সালে করবিনের দ্বিতীয় নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর, স্টারমার এমন একজন প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হন যাকে দেখতে ঠিক একজন প্রধানমন্ত্রীর মতো মনে হচ্ছিল। একই সঙ্গে তিনি বিদায়ী নেতার বেশিরভাগ নীতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
পরবর্তী চার বছরে ধাপে ধাপে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ভেঙে ফেলা হয়। কারণ স্টারমার এমন একটি মঞ্চ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা কনজারভেটিভদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগাতে পারে। পাশাপাশি ভোটারদের কাছে নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে। নির্বাচনী মাঠে এই কৌশল কাজ করেছিল; কিন্তু সরকার পরিচালনায় এটি ব্যর্থ হয়।
সেই রাজনৈতিক মঞ্চের মূল ভিত্তি ছিল তাত্ত্বিকভাবে পরিবর্তনের আশ্বাস দেওয়া। ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্টারমার এবং তার চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস বেশিরভাগ অবসরপ্রাপ্ত বয়োবৃদ্ধদের শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিল করার মতো বড় ভুল সিদ্ধান্ত নেন। এই কর্তনটি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরও আঘাত হানে। শীতকাল, জ্বালানি সংকট ও প্রবীণদের এই দুর্দশার প্রতীকটি জনমানসে এক নিষ্ঠুর বার্তা দেয়। এটি ছিল তাদের নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারার মতো একটি সিদ্ধান্ত।
স্টারমার এবং রিভস প্রায় এক বছর পর এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে (ইউ-টার্ন নিয়ে) তাদের দুর্বলতা এবং ভুল বিচারকেই আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলেন। তবে গত বছরের জুনে প্রতিবন্ধী ভাতার পরিকল্পিত কর্তন থেকে তাদের যে ইউ-টার্ন নিতে হয়েছিল, সেটিই মূলত চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে আনে।
ভোটারদের এই তীব্র অসন্তোষের ঝড় স্টারমার হয়তো সামাল দিতে পারতেন যদি তার প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিগুলো মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার কোনো আভাস দিতে পারত। যদি ব্রিটেনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যেত, তবে স্টারমারের জন্য পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা সহজ হতো। চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রোগীদের লম্বা তালিকা হয়তো বন্ধ হয়েছিল; কিন্তু লেবার সরকারের প্রথম বছরেই বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির পরও হাসপাতালের চিকিৎসকরা ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ফলে প্রগতির চাকা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই থমকে যায়।
ঋষি সুনাকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোরভাবে যে অবৈধ অভিবাসী বা বোট সমস্যাকে স্টারমার নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, তাও তিনি বন্ধ করতে পারেননি। অবৈধ অভিবাসীদের বোট আসা বন্ধ হয়নি। তবে যে সমস্যাগুলো স্টারমার সমাধান করতে পারেননি তা তিনি রেখে যাচ্ছেন উত্তরসূরির জন্য। এমন এক সমস্যা যা আসলে খুব দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়।







