স্টারমারের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, কে এই রাজনীতিবিদ

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম- রয়র্টা
যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপ-নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। এই বিজয়ের পর লেবার পার্টির নেতা ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ আরও সুগম হলো তার।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতৃত্ব পাওয়ার লড়াইয়ে দুইবার অংশ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসন থেকে নতুন করে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশের প্রায় দ্বারপ্রান্তে তিনি। চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমার জন্য সুপরিচিত বার্নহ্যাম। গত ৯ বছর ধরে দায়িত্বে আছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র পদে।
ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বার্নহ্যামের এখন দরকার লেবার পার্টির আরও ৮০ আইনপ্রণেতার সমর্থন।
শুক্রবার ভোরের দিকে ঘোষিত ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, মেকারফিল্ড আসনে বার্নহ্যাম তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকের প্রার্থী রবার্ট কেনিয়নকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। এর মাধ্যমে হাউসব অব কমন্সের সেই কাঙ্ক্ষিত আসনটি নিশ্চিত করলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে নামার জন্য এটি প্রয়োজন ছিল।
বার্নহ্যাম মোট ২৪ হাজার ৯২৭টি ভোট পেয়ে কেনিয়নের চেয়ে ৯ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। বিজয়ী ভাষণে বার্নহ্যাম বললেন, ‘রাজনীতি যে ঠিকঠাক চলছে না, তা সবাই জানে। দেশের পরিস্থিতি যেখানে থাকা উচিত ছিল, সেখানে নেই। এটি সবাই টের পাচ্ছে। আজকের এই রাতটি হয়তো একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। এখান থেকে আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব যাতে দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার সমার্থক শব্দ হয়ে ওঠে মেকারফিল্ড।’
বার্নহ্যামের এই বড় জয়ের পর সম্ভাব্য পদত্যাগের মুখে স্টারমার। অথবা লেবার পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বার্নহ্যাম ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই সংসদ সদস্যরা (এমপি) তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী বেছে নিতে পারেন। আর বার্নহ্যাম যদি স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ করেন, তবে তিনিই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী।
কেই এই বার্নহ্যাম
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জন্ম ১৯৭০ সালে লিভারপুলে। তারা বাবা ছিলেন টেলিফোন প্রকৌশলী ও মা ছিলেন চিকিৎসকের রিসেপশনিস্ট। চেশায়ারের কালচেথ গ্রামে বেড়ে উঠেন তিনি। রোমান ক্যাথলিক স্কুলে পড়াশোনার হাতেখড়ি বার্নহ্যামের। ২০২৩ সালে ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।
পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বার্নহ্যাম। প্রথমে দক্ষিণ লন্ডনের আইনপ্রণেতা টেসা জোয়েলের গবেষক এবং পরে তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্রিস স্মিথের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।
কেমব্রিজে পড়ার সময় ওলন্দাজ বংশোদ্ভূত মারি-ফ্রান্স ভ্যান হিলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০০০ সালের অক্টোবরে তারা বিয়ে করেন এবং বর্তমানে তাদের তিনটি সন্তান রয়েছে। ২০০১ সালে উত্তর ইংল্যান্ডের লেই আসন থেকে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন তিনি। পরে টনি ব্লেয়ারের ‘নিউ লেবার’ সরকারের কনিষ্ঠ মন্ত্রী হন বার্নহ্যাম। গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় তিনি ট্রেজারির চিফ সেক্রেটারি, সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং সর্বশেষ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে হিলসবোরো স্টেডিয়াম ট্র্যাজেডির ২০তম বার্ষিকীর স্মরণসভায় বার্নহ্যামকে দর্শকদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের ৯৭ সমর্থক মারা যায়। এই ঘটনা তার মনে গভীর দাগ কাটে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার নিশ্চিতে সোচ্চার হন তিনি। তার প্রচেষ্টাতেই এই ঘটনার দ্বিতীয়বারের মতো তদন্ত শুরু হয়েছিল।
২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির পরাজয়ের পর বার্নহ্যাম দলের নেতৃত্বের লড়াইয়ে অংশ নিয়ে চতুর্থ হন। ২০১৫ সালে আবারও চেষ্টা করেও বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন। পরে করবিনের টিমেও কাজ করেন। ২০১৭ সালে তিনি পার্লামেন্ট ছেড়ে দেন এবং ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচিত হন।
করোনা মহামারির সময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে সমর্থকরা তাকে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরাঞ্চলের রাজা) উপাধি দেয়। বার্নহ্যামকে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে চেনেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উপদেষ্টা জন ম্যাকটার্নান। তার মতে, ‘তিনি (বার্নহ্যাম) শুধু আশাবাদী ও হাসিখুশিই নন, একজন রাজনীতিবিদ হওয়াটাই তিনি বেশ উপভোগ করেন বলে মনে হয়। নেতারা হয় আপনাকে অনুপ্রাণিত করবেন, নয়তো কিছুটা বিষণ্ণ করে তুলবেন।’
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক রবার্ট ফোর্ডের মতে, বার্নহ্যামের নেতৃত্বে ম্যানচেস্টারের স্থানীয় অর্থনীতি বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। শহরের বাস চলাচলের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করে তিনি বড় পরিবহন সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হন।
২০২২ সালে স্টারমার মজা করে বলেছিলেন, বার্নহ্যাম তার শৈশবের প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন। কিন্তু বিষয়টি বেশ গোলমেলে ছিল। কারণ একই সঙ্গে তিনি তার শৈশবের প্রিয় দল ফ্রান্সকে ফাইনালে হারতে এবং মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে হারতে দেখেছেন।
যুক্তরাজ্য ৪০ বছর ধরে ভুল পথে রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন বার্নহ্যাম। তবে ম্যানচেস্টারের সফল মেয়র হিসেবে কাজ করলেও ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক ফোর্ড।
এদিকে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে এক বিশাল জয় এনে দেওয়ার পরও কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর জনগণের ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তার পদত্যাগের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। গত মে মাসে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে লেবার পার্টির শোচনীয় পরাজয়ের পর দলটির ভেতর থেকেই স্টারমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। দুই বছরের কম সময়ে স্টারমার সরকারের ২০ মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। যাদের প্রায় অর্ধেকই তার নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ নীতিগত বিষয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্বেও জড়িয়েছেন (যার মধ্যে ওয়েস স্ট্রিটিংও রয়েছেন)।
তবে পদত্যাগের দাবি নাকচ করেছেন স্টারমার। যেকোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, এই সময়ে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা দেশের জন্য খারাপ হবে।





