প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন ইয়েমেনি মা

ইয়েমেনের তাইজে প্লাস্টিক ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করছেন ফাতিমা আবদুল্লাহ কাসেম। ছবি: রয়টার্স
যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। আশ্রয় নিয়েছেন ইয়েমেনের অবরুদ্ধ তাইজ শহরের একটি জরাজীর্ণ ভবনে। মাথার ওপর নেই ছাদ, শীত থেকে বাঁচার মতো কম্বলও নেই। খাবার জোগাড় করতে এখন রাস্তায় রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করছেন দুই মা। তাতেও জুটছে না সন্তানদের দুবেলা খাবার। প্রতিদিনের জীবন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই।
তিন সপ্তাহ আগে নিজেদের গ্রাম থেকে পালিয়ে তাইজ শহরে আশ্রয় নেন দুই নারী। তাদের দুজনই স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন। একজনের আট সন্তান, অন্যজনের সাত সন্তান। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে আগে সবজি বিক্রি করতেন তারা। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।
জাতিসংঘ বলছে, ইয়েমেনে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় তিন লাখ মানুষের অর্ধেকই আশ্রয় নিয়েছেন তাইজ শহরে। গত ৩ অক্টোবর থেকে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় শহরটি অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথও। শহরের বেসামরিক মানুষও বাইরে যেতে পারছেন না।
ফাতিমা আবদুল্লাহ কাসেম জানান, তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের আল-দাবাব এলাকার আল-সায়াহি গ্রামে তাদের বাড়ি ছিল। সেখানে লড়াই ছড়িয়ে পড়লে তিন সপ্তাহ আগে গভীর রাতে সন্তানদের নিয়ে পায়ে হেঁটে পালিয়ে যান তারা। বর্তমানে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে ভবনটির অবস্থা এতটাই নোংরা ছিল যে, সেখানে ওঠার আগে দুই দিন রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে তাদের।
নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে ফাতিমা বলেন, ‘দেখুন, ভবনটি খোলামেলা। চারপাশে শুধু ত্রিপল টাঙানো। আমরা ত্রিপল দিয়ে থাকার জায়গা তৈরি করেছি। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমাদের কোনো কম্বল নেই, কিছুই নেই। আল্লাহ্’র কসম, আমাদের কিছুই নেই।’
আট সন্তানের জননী ফাতিমা স্বামীর সঙ্গে থাকেন না। ২০১৭ সালে স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক ছেলেকে হারিয়েছেন তিনি। এখন অন্য এক মা ইন্তিজার আহমেদ সাঈদের সঙ্গে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করে সন্তানদের খাবার জোগাড়ের চেষ্টা করছেন।
সাত সন্তানের জননী ইন্তিজার বিধবা।
প্লাস্টিকের বোতল বিক্রি করে
যা আয় হয়, তা
দিয়ে সন্তানদের খাবার জোটানোও সম্ভব
হচ্ছে না বলে জানান
তিনি।
ইন্তিজার বলেন, ‘প্রতিদিনই আমার জীবন সংগ্রামের। আল্লাহ্’র কসম, প্রতিদিন লড়াই করতে হয়। ১ হাজার ৫০০ রিয়াল আয় করতে কাজ করি, যা প্রায় শূন্য দশমিক ৯৬ ডলারের সমান। এই টাকায় কিছুই হয় না। আলু, টমেটো, মরিচের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। আমার মেয়েরা সবাই ঘরে থাকে। তাদের নিয়ে কোথায় যাব? তাদের দেখাশোনা করার মতো পরিশ্রম করার কেউ নেই। পরিবারের পুরুষ সদস্য বলতে আমার ১৫ বছরের ছেলে। কিন্তু এখন কাজও পাওয়া যায় না।’
যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের কাছে খাবার, আশ্রয় ও নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় সংকট। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রাম করতে হচ্ছে এসব মাকে।
সূত্র: রয়টার্স





