জীবন বাঁচাবে যে কাঠবিড়ালি

আর্কটিকের বরফঢাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বাস করে ছোট্ট এক প্রাণী। দেখতে সাধারণ কাঠবিড়ালির মতো। কিন্তু এর শরীরের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ ক্ষমতা। সেই ক্ষমতাই এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
গ্রীষ্ম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কাঠবিড়ালি খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘাস, পাতা ও বিভিন্ন উদ্ভিদ খেয়ে শরীরে চর্বি জমায়। এরপর মাটির নিচে নিজের গর্তে ঢুকে পড়ে। শুরু হয় দীর্ঘ শীতনিদ্রা।
এই ঘুম কয়েক দিনের নয়। টানা প্রায় আট মাস। এ সময় সে কিছু খায় না, পানি পান করে না। শরীরের সব কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমে আসে।
মিনিটে মাত্র কয়েকবার শ্বাস নেয়। হৃদস্পন্দনও নেমে আসে খুবই নিচে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে প্রাণীটি মৃত। কিন্তু বাস্তবে সে জীবিত থাকে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পৃথিবীর আর কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী এত কম শরীরের তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে না। তার মস্তিষ্কের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। শরীরের কিছু অংশের তাপমাত্রা শূন্যেরও নিচে চলে যায়। তারপরও তার শরীর সচল থাকে।
বসন্ত এলেই সে আবার জেগে ওঠে। গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে। যেন কিছুই ঘটেনি।
এই অসাধারণ ক্ষমতার কারণেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে আর্কটিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল। গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ প্রাণী নিয়ে গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছে আর্কটিকের মতো পরিবেশ। সেখানে অন্ধকার ও ঠান্ডা কক্ষে রাখা হয় কাঠবিড়ালিগুলোকে। বিজ্ঞানীরা নিয়মিত তাদের শরীরের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন ও রক্ত পরীক্ষা করেন। অনেক সময় বুঝতেই কষ্ট হয় প্রাণীটি জীবিত নাকি মৃত।
বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য শুধু একটি প্রাণীকে বোঝা নয়। তারা জানতে চান, মানুষের শরীরেও কি নিরাপদভাবে এমন অবস্থা তৈরি করা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে জরুরি চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
ধরা যাক, একজন মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। অথবা স্ট্রোক হয়েছে। আবার কেউ গুরুতর দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই মূল্যবান।
মানুষের শরীরের বিপাকক্রিয়া কিছু সময়ের জন্য ধীর করা গেলে অক্সিজেনের চাহিদাও কমে যাবে। এতে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বেশি সময় সুরক্ষিত থাকবে। চিকিৎসকেরাও রোগীকে বাঁচানোর জন্য অতিরিক্ত সময় পাবেন।
বর্তমানে চিকিৎসকেরা অনেক রোগীর শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শরীর তখন কাঁপতে শুরু করে। আবার নিজেই গরম হওয়ার চেষ্টা করে। ফলে চিকিৎসা কঠিন হয়ে যায়।
আর্কটিক কাঠবিড়ালির শরীরে এমন সমস্যা হয় না। তার শরীর নিজেই ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যায়। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রাণীর শরীরের রহস্য একদিন নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির পথ দেখাতে পারে।
গবেষণায় অ্যাডেনোসিন নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ অণুর সন্ধান মিলেছে। এটি মানুষের শরীরেও থাকে। ঘুম আসার সঙ্গে এই অণুর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই অণুই শীতনিদ্রার অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে।
শুধু তাই নয়, আট মাস ঘুমিয়ে থেকেও এই কাঠবিড়ালির পেশি নষ্ট হয় না। হার্ট ও মস্তিষ্কও স্বাভাবিক থাকে। এই ক্ষমতা যদি মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়, তাহলে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী রোগীদের জন্য নতুন চিকিৎসার পথ খুলতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শীতনিদ্রার সময় কাঠবিড়ালির শরীরে আয়োডাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি হার্ট অ্যাটাকের পর হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এ নিয়ে মানুষের ওপরও প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
এই গবেষণার সম্ভাবনা শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে মহাকাশ ভ্রমণেও এর ব্যবহার হতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় মহাকাশচারীদের শীতনিদ্রার মতো অবস্থায় রাখা গেলে খাবার, অক্সিজেন ও অন্যান্য সম্পদের প্রয়োজন অনেক কমে যাবে।
ছোট্ট এই কাঠবিড়ালি জানে না, তাকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে প্রতিদিন নতুন নতুন পরীক্ষা চলছে। তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, তার শরীরে লুকিয়ে থাকা রহস্য একদিন হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, মস্তিষ্কে আঘাত ও গুরুতর দুর্ঘটনায় আক্রান্ত অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।






