লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
- ৪০ বছর ধরে ভুল পথে ব্রিটেন
- প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন আগামী সোমবার

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম- রয়টার্স
যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। শুক্রবারের বিশেষ দলীয় সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। পরপরই সেন্ট্রাল লন্ডনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণেই দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচারের সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি বলেছেন, ‘ গত ৪০ বছর ধরে ভুল পথে রয়েছে যুক্তরাজ্য।’
বার্নহ্যামের দাবি, ১৯৮০-এর দশক থেকে অনুসৃত কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা, ব্যাপক বেসরকারিকরণ এবং মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিই বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, আঞ্চলিক বৈষম্য ও জনসেবার দুর্বলতার অন্যতম কারণ। দলীয় নেতৃত্বের দৌড়ে বার্নহ্যাম ছিলেন একমাত্র প্রার্থী। তিনি লেবার পার্টির ৪০৩ এমপির মধ্যে ৩৭৯ জনের সমর্থন নিশ্চিত করেছেন। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নেতা নির্বাচিত হন। এর আগে মনোনয়ন পর্বেই তার পক্ষে পর্যাপ্ত সমর্থন নিশ্চিত হওয়ায় ফল অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়।
প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম বলেছেন, ‘ব্রিটেন ৪০ বছর ধরে ভুল পথে রয়েছে। এই পথ উত্তর ইংল্যান্ডের বহু সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
তার ভাষায়, ১৯৮০-এর দশকের শিল্পবিনাশ (ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন), পরবর্তী সময়ের নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ (ডিরেগুলেশন), ব্যাপক বেসরকারিকরণ এবং ২০১০-এর দশকের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি মিলেই এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করেছে, যা অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষের জন্য কাজ করেনি।
থ্যাচার আমলের নীতির সমালোচনা করে বলেছেন, ১৯৮০-এর দশকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই লন্ডনকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা বেসরকারি খাতের হাতে চলে যায়। এর ফলে বহু শিল্পাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, স্থানীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে এবং মানুষের মৌলিক সেবার ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে। তাঁর মতে, সেই নীতির প্রভাব এখনো ব্রিটেন বহন করছে।
লেবার নেতার দাবি, গত চার দশকের অর্থনৈতিক নীতির কারণে সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য বাসস্থান, জ্বালানি, পানি ও গণপরিবহনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় বেড়েছে, অথচ স্থানীয় সরকারগুলোর ক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য কমেছে।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি ‘নতুন পথ’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন। তার পরিকল্পনায় রয়েছে স্থানীয় সরকারের হাতে আরও ক্ষমতা হস্তান্তর, গুরুত্বপূর্ণ জনসেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং এমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যার সুফল দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছাবে। তিনি বলেছেন, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ব্রিটেন কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই ব্যবস্থারও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
তবে বার্নহ্যামের এই অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, তার প্রস্তাবিত নীতিগুলো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে তার সমর্থকদের দাবি, দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও জনসেবার সংকট কাটাতে প্রচলিত অর্থনৈতিক পথ থেকে সরে আসা ছাড়া বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণের পর প্রথম বড় ভাষণেই বার্নহ্যাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি গত চার দশকের ব্রিটিশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে প্রকাশ্য মতবিরোধে যেতে প্রস্তুত। আগামী সোমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তার ঘোষিত নীতিগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগই এখন ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।






